দেহ আর মন মিলেই মানুষ। দেহ-মনের কোনো একটি অসুস্থ হলে মানুষ স্বাভাবিক থাকতে পারে না। বর্তমানে শারীরিক চিকিৎসার ব্যাপ্তি বাড়লেও মানসিক চিকিৎসায় বিশ্ব জুড়েই রয়ে গেছে সংকট। অথচ মানসিক রোগের বিস্তার কমেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশ্বে ৩০ কোটির বেশি মানুষ বিষন্নতায় ভুগছে। যার প্রভাব পড়ছে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতায়। বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৯ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের সাড়ে ১৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে কেউ না কেউ আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ হারায়। ১৪ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে আট লাখ লোক আত্মহত্যায় মারা যায়। মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মহত্যার এ হার কমিয়ে আনা সম্ভব বলেও অনেক গবেষক মতামত জানিয়েছেন। দেশে প্রতি বছর ঠিক কত মানুষ আত্মহত্যা করে, সেটার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। গেল এক বছরে পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ নারী-পুরুষ। স্থানীয় গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার প্রতি লাখে ৬ থেকে ১০ জন। দেশের মোট বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রয়েছে। আবার এ খাতে দক্ষ জনবলেরও স্বল্পতা আছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের ভাষ্যমতে, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে এখন মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। বিষয়টিকে সঠিক গন্তব্যের দিকে নিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। হতাশার দিক চিহ্নিত করে তারা বলেন, দেশের কত শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে, তার সঠিক তথ্য নেই।
নানাবিধ দুশ্চিন্তা ও হতাশার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। সাধারণত এটাকে মানসিক চাপ বলে। এসব মানসিক চাপ উত্তরণে ইসলামে রয়েছে অনেক দিকনির্দেশনা। যা মেনে চললে মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
হতাশ না হওয়া : অনেক ক্ষেত্রেই হতাশা থেকে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। তাই দুনিয়ার জীবনে বিপদাপদে হতাশ না হওয়াই ইমানদারকে কাজ। যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের বিপদাপদ আসতে পারে এ মানসিকতা সব সময় পোষণ করা। ফলে তা মানুষকে বিপদে হতাশা থেকে রক্ষা করে মানসিকভাবে চাপমুক্ত রাখে। কোরআনে এসব বিপদাপদ দিয়ে বান্দাকে পরীক্ষার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত : কোরআন তেলাওয়াত মানুষের অন্তরকে প্রফুল্ল করে তোলে। কোরআন তেলাওয়াত প্রফুল্লতার অনন্য উৎস। এর মাধ্যমে মুমিনের মনের প্রফুল্লতা ও মানসিক প্রশান্তি বাড়তে থাকে। কোরআনের আলোয় আলোকিত মানুষ দুনিয়ার সব দুশ্চিন্তা থেকে থাকে মুক্ত।
নামাজে যত্নবান হওয়া : যে কোনো বিপদাপদে ও পেরেশানির সময় নামাজের মাধ্যমেই প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করা যায়। কেননা নামাজের মাধ্যমেই বান্দা মহান আল্লাহর সাহায্য লাভ করে থাকে। তাই মানসিক প্রশান্তি লাভে নামাজের ব্যাপারে যতœবান হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে আমার সাহায্য প্রার্থনা করো। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। তবে বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।’ (সুরা বাকারা ৪৫) হজরত রাসুল (সা.) কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে নামাজ আদায় করতেন। ছোট থেকে ছোট কোনো বিষয়ের জন্যও তারা নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন।
বেশি বেশি ইসতেগফার করা : মানসিক চাপ সামলাতে বেশি বেশি ইসতেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করার বিকল্প নেই। যেসব কারণে মানুষ চাপে পড়ে, তন্মধ্যে অন্যায়-অপরাধ বেশি করা, অর্থকষ্টে থাকা, সন্তানসন্ততি না থাকা, জীবিকার অপ্রতুলতা ইত্যাদি। এ সবের সমাধানে কোরআনের নির্দেশ হলো ইসতেগফার করা। এ ইসতেগফারেই মানুষ উল্লিখিত সমস্যা থেকে সমাধান খুঁজে পায় বলে ঘোষণা করেছেন মহান আল্লাহ। কোরআনে এসেছে, ‘আর বলেছি, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর অজস্রধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।’ (সুরা নুহ ১০-১২) হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইসতেগফার করবে, মহান আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন। তার সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।’ (আবু দাউদ)
বেশি বেশি দরুদ পড়া : দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ বান্দার প্রতি রহমত নাজিল করেন। এ রহমত মানুষকে যাবতীয় মানসিক চাপ থেকে মুক্ত রাখে। এটি আত্মপ্রশান্তি লাভের সহজ উপায়ও বটে। কেননা হজরত রাসুল (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা এমন এক ইবাদত যে, আল্লাহ তা কবুল করে নেন। হাদিসে এসেছে, হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার ওপর অনেক বেশি দরুদ পড়তে চাই। আপনি বলে দিন আমি দরুদে কতটুকু সময় দেব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও! আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও! যদি আরও বাড়াও তা তোমার জন্য ভালো। আমি বললাম, অর্ধেক সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু সময় পড়তে পারো, যদি এর চেয়ে আরও সময় বাড়াও তোমার জন্য ভালো। আমি বললাম, তাহলে সময়ের দুই-তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও, যদি আরও বাড়াও তোমার জন্য ভালো। আমি বললাম, সম্পূর্ণ সময় আমি আপনার ওপর দরুদ পড়ায় কাটিয়ে দেব। তখন তিনি বললেন, তাহলে এখন থেকে তোমার পেরেশানি দূর হওয়ার জন্য দরুদই যথেষ্ট এবং তোমার পাপের কাফফারার জন্য দরুদই যথেষ্ট।’ (তিরমিজি)