আল্লাহতায়ালা ব্যবসাকে হালাল করেছেন। আর সুদকে করেছেন হারাম। কোরআনের ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য ব্যবসাকে হালাল করা হয়েছে আর সুদকে করা হয়েছে হারাম।’ (সুরা বাকারা ২৭৫) ব্যবসায়ীদের সুসংবাদ দিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীরা কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি) অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ব্যবসায়ী প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা)
প্রকৃত সৎ ব্যবসায়ীকে মহান আল্লাহ যেমন পছন্দ করেন, তেমনি অসৎ ব্যবসায়ীকে অপছন্দ করেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি দল রয়েছে, যারা জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা খসানোর জন্য সব সময় ওত পেতে থাকে। এটার জন্য তাদের সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা হলো পণ্য মজুদদারি করা। আরবিতে যাকে বলা হয় ‘ইহতেকার’। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘জনগণের প্রয়োজন সত্ত্বেও মূল্য বৃদ্ধির অপেক্ষায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করা থেকে বিরত থাকাকে মজুদদারি বলে।’ ইসলামে মজুদদারির ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি এসেছে। খাদ্যশস্য মজুদ রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। হজরত রাসুল (সা.) মজুদদারদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘কেউ যদি মুসলমানদের থেকে নিজেদের খাদ্যশস্য আটকিয়ে রাখে (মজুদদারি করে), তবে আল্লাহতায়ালা তার ওপর মহামারি ও দারিদ্র্য চাপিয়ে দেন।’ (আবু দাউদ)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, যে ব্যক্তি খাদ্যশস্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করবে, মহান আল্লাহ তার ওপর দারিদ্র্য এবং মহামারি চাপিয়ে দেবেন। কেননা কোনো ব্যক্তি অন্যজনকে কষ্ট দিয়ে কখনো নিজে ভালো থাকতে পারে না। তার হাত ও মুখ দ্বারা যদি অন্য কেউ কষ্ট পায়, তাহলে একদিন সেও এর শাস্তি ভোগ করবে। তা ছাড়া মজুদদারি ও খাদ্য সংকট তারাই তৈরি করে, যারা দুর্নীতিবাজ ও অসৎ লোক। সৎ ব্যক্তি কখনো তা করতে পারে না। রাসুল বলেছেন, ‘শুধু দুর্নীতি পরায়ণ ব্যক্তি খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখে।’ (ইবনে মাজাহ) অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ৪০ রাত পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য মজুদ রাখে, মহান আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকে না।’ মজুদদার ও অধিক মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে হাদিসে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, ‘পণ্যদ্রব্য মজুদ করে অধিক মূল্যে বিক্রয়কারী অবশ্যই পাপী।’ (মিশকাত) যারা দুনিয়ার জীবনে সামান্য কিছু টাকার লোভে পণ্য মজুদ করার মাধ্যমে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলেন তাদের উদ্দেশে কথা হলো, আপনারা একটু চিন্তা করে দেখুন, এই যে আপনারা মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন, আল্লাহতায়ালা কি আপনাদের এমনিতেই ছেড়ে দেবেন? তিনি কি এসবের হিসাব নেবেন না?
আমাদের মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে সম্পদশালী হওয়া গেলেও তাতে কোনো লাভ নেই। এ সম্পদে তার কোনো বরকত হবে না। বরং দুনিয়াতেই এ সম্পদ তার জন্য অভিশাপ হবে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি সৎভাবে ব্যবসা করে, তাতে কোনো রকম জুলুম করে না, মহান আল্লাহ তার ব্যবসায় বরকত দান করেন। অল্প লাভ হলেও তাতে তার প্রয়োজন মিটে যায় এবং অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রত্যাশিত অনেক নেয়ামত তাকে দান করেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘খাঁটি ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয় আর পণ্য মজুদকারী অভিশপ্ত হয়।’ (ইবনে মাজাহ)
উল্লিখিত হাদিসগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখে ব্যবসায়ীরা যদি নিজেদের জনগণের সেবায় নিয়োজিত করেন এবং সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যান, তাহলে আশা করা যায় সমাজের স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। জনমনে স্বস্তি চলে আসবে। ব্যবসায়ীদের একটু ত্যাগ ও প্রচেষ্টার কারণে যদি সমাজে শান্তি আসে, তাহলে অবশ্যই কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের প্রতিদান দেবেন।
তাই আসুন আমরা সবাই নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করি এবং ব্যবসার সব সেক্টরে মজুদদারিকে না করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন। আমিন।