সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। অপার প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর আমাদের দেশ। বিভিন্ন সমীক্ষার রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দুই দশক আগেও এ দেশ গ্যাস-কয়লার খনির ওপর ভাসছিল। যদিও গুটি কয়েক পথভ্রষ্ট মানুষের লোভে আজ আমরা কয়লা-গ্যাস সংকটে ভুগছি। আমরা ছিলাম মাছে-ভাতে বাঙালি। আমাদের পুকুর-ডোবা ও খাল-বিল কিলবিল করত মাছে। আজ দেশি মাছ দেখি না বললেই চলে। আমাদের বাতাস ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ। আমাদের নগর ছিল সবচেয়ে সুন্দর। আফসোস! আমাদের বাতাস, শহর, নদী সবই দূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে এখন। এ সবই হয়েছে ওই পথভ্রষ্ট লোভী দুর্নীতিবাজ মানুষের কারণে। একটি দেশের ওপর যখন দুর্নীতির কালো থাবা পড়ে, তখন ওই দেশটি ভাঙা কাচের মতো চৌচির হয়ে যায়। এ জন্য হজরত রাসুল (সা.) বারবার সাবধান করে বলেছেন, ‘তোমরা লোভ থেকে বেঁচে থাকো। লোভ তোমাদের সেভাবে নিঃশেষ করে দেবে যেভাবে একটি ক্ষুধার্ত বাঘ ছাগলকে খেয়ে ফেলে।’ (জামে তিরমিজি)
শুধু মুখে বলেই থেমে থাকেননি, রাসুল (সা.) বাস্তবেও ছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘মক্কা বিজয়ের দিন কুরাইশ বংশের একজন সম্ভ্রান্ত নারী চুরির দায়ে আটক হন। সবাই চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েন, কীভাবে তাকে শাস্তি থেকে বাঁচানো যায়। একে তো কুরাইশ বংশ, অন্যদিকে সম্ভ্রান্ত নারী। হাত কাটা পড়লে মান-কুল সবই যাবে। সাহাবিদের একটি দল ঠিক করল হজরত রাসুল (সা.)-এর কাছে বিষয়টি বলা দরকার। কে বলবে? কার সাহস আছে নবীজির কাছে চোরের পক্ষ নিয়ে কথা বলার। রাসুল (সা.)-এর পালক পুত্র যায়েদের ছেলের নাম উসামা। উসামা বয়সে ছোট। নবীজির কলিজার টুকরো। সাহাবিরা উসামাকে শিখিয়ে দিলেন, দাদার কাছে গিয়ে বলো, ওই নারীর শাস্তিমওকুফ করা হোক। উসামা হাসতে হাসতে কথাটি রাসুল (সা.)-কে বললেন। রাসুল (সা.) বুঝে ফেলছেন এ কাজ ছোট উসামার নয়। নিশ্চয় এখানে বড়দের হাত আছে। রাসুল (সা.) উসামাকে বললেন, ‘হে কলিজার টুকরো নাতি! তুমি কী আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে আমাকে সুপারিশ করছ?’ উসামা কেঁপে উঠল। ছোট মুখে বড় কথার ওজন বুঝতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে ক্ষমা করুন। আমি বুঝতে পারিনি।’
ওই দিন সন্ধ্যায় রাসুল (সা.) বিষন্ন মনে রাগী চেহারায় মিম্বারে দাঁড়ালেন। গম্ভীর কণ্ঠে সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় সাহাবিরা! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মত এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের প্রভাবশালীরা অন্যায় করলে পার পেয়ে যেত আর দুর্বলরা কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতো। আমার প্রাণ যে আল্লাহর হাতে তার কসম! যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি দায়ে গ্রেপ্তার হতো, আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম। তোমরা ওই নারীর শাস্তি প্রয়োগে দেরি করো না। সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিরা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করেন।’ (সহিহ্ বুখারি) এ দীর্ঘ হাদিস থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়, ভালো বংশের সম্ভ্রান্ত মানুষও চরিত্র দোষে জনগণের সম্পদ চুরি করতে পারে। এ ধরনের চোরকে আইনের আওতায় না আনলে দেশ ধ্বংসের গর্তে মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই রাসুল (সা.) দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিপ্রয়োগ করে সাবধান করে দিয়েছেন, স্বভাব চোরদের বিচারে সময় ক্ষেপণের সুযোগ নেই। আর যারা চিহ্নিত চোরের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে, তাদের ব্যাপারেও রাসুল (সা.) কঠোর কথা বলেছেন। অতীতে প্রভাবশালী ও ভালো বংশের বড় চোরদের ছেড়ে দেওয়া হতো আর বিচার করা হতো গরিব-দুর্বল চোরদের। এ জন্য আল্লাহ ওই উম্মতদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমরা যদি প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের সঠিক বিচার করতে না পারি তাহলে আমাদের জন্যও চির ধ্বংস এবং চির জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। তাই আসুন যার যার অবস্থান থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করি। জনগণের সম্পদ আত্মসাতকারীদের শাস্তি না হলে দেশ আরও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের বোঝার তৌফিক দিন। আমিন।