করোনা মহামারীর সময় দেশ জুড়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে হাত ধোয়ার জোরালো অভ্যাস গড়ে উঠলেও সচেতনতার অভাবে তাতে ভাটা পড়েছে। দুই বছর আগেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢোকার মুখে হাত ধোয়ার নানান ব্যবস্থা ছিল। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে মোড়ে হাত ধোয়ার অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে সরকার। কিন্তু করোনার প্রকোপ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাপনা ও অভ্যাসও প্রায় বিদায় নিয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’।
এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিষ্কার হাত সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ’। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর কাকরাইলে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের প্রতিনিধিদের এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। দেশের জেলা ও উপজেলা শহরে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের কর্মসূচি পালন করবেন সংস্থাটির প্রকৌশলীরা। তাছাড়া প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন ও ব্যানারের মাধ্যমে এবং অনলাইনে হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে দিবসটি পালন করা শুরু হয়। ওই বছরের ১৫ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোমে বিশ্ব পানি সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম এ দিবসটি পালন করা হয়। পরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দিবসটি প্রতি বছর পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা তৈরি ও উদ্বুদ্ধকরণের জন্য চালানো এটি একটি প্রচারণামূলক দিবস। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের মূল লক্ষ্য সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার একটি সাধারণ সংস্কৃতির সমর্থন ও প্রচলন করা, প্রতিটি দেশে হাত ধোয়ার বিষয়ের নজর দেওয়া ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
এ প্রসঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মীর আব্দুস সহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে মানুষকে হাত ধোয়ার বিষয়ে সচেতন করতে সারা দেশে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি নিশ্চিতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।’
হাত না ধোয়ায় হতে পারে যেসব রোগ : বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো করোনাভাইরাস মহামারী ছড়িয়ে পড়লে দেশে সবাই হাত ধোয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া হলে করোনাভাইরাস মরে যায় এ কারণেই তখন মূলত দেশে হাত ধোয়ার অভ্যাসের এক প্রকার বিপ্লব হয়েছিল। কিন্তু শুধু করোনাভাইরাস থেকেই নয়, হাত ধোয়ার কারণে আরও অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, অবচেতনভাবে প্রতিনিয়ত আমরা হাত দিয়ে ক্রমাগত চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করে থাকি। হাত অপরিষ্কার থাকলে এমন স্পর্শের মাধ্যমে দেহের ভেতরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে খাবার গ্রহণের আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধোয়া অপরিহার্য। তাছাড়া বাইরে থেকে বাসা বা কর্মস্থলে ঢোকার সময়ও হাত ধোয়া জরুরি। হাত না ধুয়ে ছোট্ট শিশুদের কোলে নিলে তারাও নানা রোগের জীবাণুতে সংক্রমিত হতে পারে।
শুধু পানি দিয়ে হাত ধুলেই জীবাণুমুক্ত হয় না। সঠিক নিয়মে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া লাগে। তা না হলে নানারকম ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য জীবাণু হাতের মাধ্যমে খাদ্যের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করে। যার ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও করোনার মতো নানা সংক্রামক রোগ হতে পারে।
১০ লাখ ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু কমাতে পারে হাত ধোয়া : এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২০১২-১৩ সালে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ, তবে বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে।
ইউনিসেফের এক জরিপ অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন শিশু বা প্রতি চারজনে একজন শিশু ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়ায় মারা যায়। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে বছরে প্রায় ১০ লাখ ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু এবং প্রায় ১৬ শতাংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে বলে মনে করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে শুধু পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করলে তাতে জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে ক্ষারযুক্ত সাবান, তরল সাবান বা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার এসব ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু ধ্বংসের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বস্তুত সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করার অভ্যাস যেকোনো মহামারী বা রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ, কিংবা নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে।