অনলাইন জাতীয়তাবাদের বিপদ

আপনার স্মার্টফোন আপনার হাতে না স্মার্টফোনের মুঠোয় আপনি? ডিজিটাল দুনিয়া আর বাস্তবের দুনিয়ার মধ্যে সীমারেখা দিন দিন মøান হয়ে আসছে। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত বয়ান অনেক ক্ষেত্রেই আপনার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার গতিপথ নির্ধারণ করছে। কিন্তু কীভাবে?

মানুষ ভীষণভাবে দ্বান্দ্বিক জীব। সে একই সঙ্গে স্বতন্ত্র এবং সমাজবদ্ধ। তবে স্বীকৃতি বা অনুমোদন প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা একটি আদি প্রবৃত্তি বলা চলে। এই প্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ প্রিয়জন, পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বীকৃতি বা অনুমোদন কামনা করে। ভোক্তার এই আকাক্সক্ষাকে সর্বোতভাবে কাজে লাগায় সামাজিক মাধ্যমসহ সব অনলাইন মাধ্যম। প্রচার বা প্রচারণা যারই হোক ভোক্তার অংশগ্রহণ, মিথস্ক্রিয়া এবং পরিশেষে সর্বক্ষণ নিমগ্ন বা নিমজ্জিত দশা নিশ্চিত করাই অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্য ও বিধেয়।

বাস্তববিচ্যুত ভোক্তার এই নিমগ্ন দশার প্রতিফলন ঘটে নানাভাবে। সেপ্টেম্বরের এক সকালে দক্ষিণ চীনের একটি জাপানি স্কুলের ফটকের দিকে এগোনোর সময় ১০ বছর বয়সী একটি ছেলেকে এক অচেনা ব্যক্তি ছুরিকাঘাত করে। আহত বালক পরবর্তী সময় মারা যায়। বিবিসিতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, জেনোফোবিয়া বা বিদেশাতঙ্কের জেরেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছে জাপান সরকার। আর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই হামলার জন্য সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক এবং জাপানবিরোধী পোস্টকে দুষেছেন। অনেকের মতে, এই করুণ ঘটনা অনলাইন জাতীয়তাবাদের চিহ্ন, চীনে গেল কয়েক বছর ধরেই যা প্রবল হয়ে উঠছে। জাতীয়তাবাদী ইনফ্লুয়েন্সার ও ব্লগাররা দেশপ্রেম এবং আদর্শিক শুদ্ধতার ডাক দিচ্ছেন। তাদের নির্মিত বয়ানের ন্যূনতম স্খলনেও চীনা ব্যক্তিত্বদের দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তব সহিংসতারও কারণ হয়ে উঠছে। ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে চীনে চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। এর আওতায় চীনা সমাজতান্ত্রিক দলের কথিত আদর্শিক শত্রু নিধনে অভিযান চালানো হয় এবং লোহিত রক্ষী নামে পরিচিত যুবা আধা সামরিক বাহিনীর হাতে লাখো মানুষের মৃত্যু হয় যাদের অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, শিল্পী। অনেকেই সেই সহিংস, রাষ্ট্রচালিত প্রচারাভিযানের ছায়া দেখতে যাচ্ছেন আজকের অনলাইন জাতীয়তাবাদীদের কর্মকাণ্ডে যাকে তারা বলছেন ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব ২.০’।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চীনের অনলাইনে জাতীয়তাবাদী ব্লগার ও ইনফ্লুয়েন্সাররা গেল কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। বিশিষ্ট ইনফ্লুয়েন্সাররা চীন এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গুণকীর্তন এবং চীনের শত্রুদের মুন্ডুপাতমূলক কনটেন্টের বন্যা বইয়ে দিয়ে কোটি কোটি ফলোয়ার বা অনুসারী জোগাড় করতে পারছেন এবং সেই ট্রাফিক থেকে উপার্জন করছেন। তারা বামপন্থি বিপ্লবের নামে কথা বললেও তাদের আচরণ বিদেশাতঙ্কমূলক ও প্রতিক্রিয়াশীল মন্তব্যনির্ভর চরম ডানপন্থিদের মতোই। চীনকে ফের ‘মহান’ করে তোলার কল্পিত অভিযান পরিচালনাকারী এই ইনফ্লুয়েন্সাররা চীনা সমাজের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করতে চান এবং সব অভিজাত ও বিদেশি শক্তিকে তাদের লক্ষ্যের পথে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচনা করেন।

অনলাইন, সাইবার বা ইন্টারনেট জাতীয়তাবাদ যাই বলি না কেন, এটা আসলে কী? এই জাতীয়তাবাদ ইন্টারনেটকেন্দ্রিক তৎপরতানির্ভর। ইন্টারনেট ভৌত সীমারেখাবিহীন যোগাযোগ সহজ করে দিয়েছে। ডিজিটাইজেশনের ফলে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষ এমনভাবে সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন যেন তারা একই গ্রামের বাসিন্দা। এর ফলে যারা একক মতবাদ ও আদর্শিক অবস্থানের বিস্তারে বিশ্বাসী তারা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিতে সক্ষম হচ্ছেন। বৈচিত্র্য ও ভিন্নমতের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান সংহত করা এবং জাহির করারও এন্তার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে গোঁড়া মতবাদ ও চরমপন্থার চারণভূমি হয়ে উঠছে নানা ডিজিটাল মাধ্যম, যেখানে রাষ্ট্রীয় খবরদারি ও নজরদারিও ততটা জোরদার নয়। অনলাইনের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনেও তা ছলকে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা যেমন, তেমনি ক্ষমতা কাঠামোয় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে যাদের এবং সেই সঙ্গে বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী অনলাইন জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে স্বার্থ হাসিলের উপায় খুঁজছে। অনলাইন জাতীয়তাবাদ মূলত উগ্র চেতনা এবং জেনোফোবিয়া বা বিদেশাতঙ্ককে উসকে দেওয়ার মাধ্যমে গণসমর্থন আদায় করে নেয়। চীন, জাপান, রাশিয়া এবং ভারতে এর ব্যাপক নজির দেখা গেছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক মাধ্যমের মানচিত্রে কি অনলাইন জাতীয়তাবাদ ছায়া ফেলতে শুরু করেছে? অভীষ্ট বয়ানের বিরুদ্ধে গেলেই ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’, ‘হ্যালো সুশীল’, ‘আফসোস লীগ’ এ ধরনের নানা অভিধায় ক্যানসেল বা বাতিল করার প্রবণতা তীব্র হয়ে উঠছে। এই ক্যানসেল কালচার নতুন নয়, বিগত রেজিমের সময় আমরা দেখেছি বিরুদ্ধ বা ভিন্নমত দমনে ‘রাজাকার’ শব্দের অতি ব্যবহার। প্রশ্ন হচ্ছে, রেজিমের পাল্টা বয়ানে সেই ক্যানসেল কালচার কি আরও তীব্রভাবে ফেরত আসবে কিনা। মব জাস্টিস বা জনতার ন্যায়ের নামে গণপিটুনিতে হত্যার মতো চরম সহিংসতা ঘটেছে বারবার। নয়া সাংস্কৃতিক বয়ান নির্মাণের হিড়িক পড়ে গেছে আর সেই উদ্যোগের প্রতিফলন স্বরূপ নানা ধরনের উগ্র চেতনার বিকাশও চোখে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলা-ভাঙচুর, রাজধানীতে নারী পর্বতারোহীর ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, পূজা মণ্ডপে ইসলামি সংগীত পরিবেশনের মতো ঘটনাগুলো বিচলিত হওয়ার মতোই। চীনের মতো বাংলাদেশেও জাতীয়তাবাদী ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যাপক উত্থানও দেখা যাচ্ছে, যারা বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অতীত ও বর্তমানের বয়ানের বিনির্মাণ করছেন বা আদর্শিক মতবাদের প্রচার ঘটাচ্ছেন। নিঃসন্দেহে তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও এসব কনটেন্টকে এগিয়ে রাখছে, কারণ এগুলোতে এনগেজমেন্ট বা অংশগ্রহণ এবং মিথস্ক্রিয়া বেশি হয়ে থাকে। অনলাইন জাতীয়তাবাদ দিন শেষে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, কাজেই এর বিপদগুলো নিয়ে সচেতন থাকা এবং অংশগ্রহণ কিংবা স্বীকৃতির স্বস্তির তোয়াক্কা না করে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

naziabdafrin@gmail.com