রাষ্ট্র বলতে আমাদের সামনে যে কাঠামোটি ভেসে ওঠে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আলোকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাম্প্রতিকতম হলো রাষ্ট্র। পরিবার হলো এর মধ্যে সবচেয়ে আদি। এরপর মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কত-শত সামাজিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। মূলত বিরুদ্ধ পরিস্থিতির বিপক্ষে গিয়ে অস্তিত্বের সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও এ সম্পর্কিত পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করাই যে ছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখ্য উদ্দেশ্য তা সহজেই অনুমেয়। মানব সংস্কৃতি কখনোই স্থির ছিল না, সর্বদাই পরিবর্তনশীল। মানব সমাজের আকার-আকৃতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন অনুষঙ্গ যেমন যোগ হয়েছে, আর কোনো কোনোটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আবার এর সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক স্থিতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা সুরক্ষায়, নিয়মনীতির প্রতিপালন প্রভৃতি বিষয় মানব সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে থাকল নিঃসন্দেহে প্রয়োজনের তাগিদে। আজ এই পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮০০ কোটির বেশি। ১৯০০ সালে এই জনসংখ্যা ছিল ১৬০ কোটি আর ১৭০০ সালে যা ছিল ৬১ কোটি।
পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে শাসন কাঠামো ইতিহাসের পরতে পরতে বিভিন্নভাবে এসেছে। আমরা গোত্রের কথা শুনেছি, সামন্ত রাজার কথা শুনেছি, মহারাজার কথা শুনেছি। পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় শাসনের নানা ধরনের ব্যবস্থাপনা দেখেছি। পোপের সঙ্গে সম্রাটদের মাখামাখি, কিংবা শাসন ব্যবস্থায় চর্চার আধিপত্য বা ধর্মীয় পরিচয়ে জনপদের পর জনপদ দখল কিংবা লুট সবকিছুই হয়েছে। প্রাচীন যুগ কিংবা মধ্যযুগে তো বটেই তার পরবর্তীকালে সম্রাট বা শাসকদের বৈধতা নির্ধারিত হতো নির্দিষ্ট ধর্ম, গোষ্ঠী ও বিশ্বাসের স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সেই অবস্থা পার করে আজকের অবস্থায় এসেছে বিশেষ কিছু নীতি-নৈতিকতা ও প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে।
প্রশ্ন হচ্ছে কোনো একটি সমাজকে রাষ্ট্র হয়ে ওঠার জন্য কী প্রয়োজন? রাষ্ট্র হয়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পরিচালনার মূলনীতি নির্ধারণ ও এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদান। আগেকার ব্যবস্থায় জনগণের যে আনুগত্য সম্রাট, রাজা ও সামন্ত প্রভুদের প্রতি ছিল তা এখন নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, একটি নির্দিষ্ট সামাজিক চুক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর আরোপ করা হয়ে থাকে। আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তি এর প্রতিষ্ঠানসমূহ যে প্রতিষ্ঠানসমূহ রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি ন্যূনতম কিছু বিষয়ের ওপর ঐকমত্য পোষণ করে থাকে। তবে আধুনিকতার মূল বার্তা হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সমতা ও সাম্য, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা ও কল্যাণকর রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা। তাই সফল রাষ্ট্র হয়ে ওঠার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী-নিরপেক্ষ হয়ে উঠতে হয়। রাষ্ট্রীয় ন্যূনতম সামাজিক চুক্তি বাস্তবায়নে সক্রিয় এবং একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠতে হয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী থাকা খুবই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এদের সবাইকে ধারণ করে সমাজে সবার জন্য সম-সুযোগ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই কাজ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যত বেশি দক্ষ ও সক্রিয় হতে পারবে, নিরপেক্ষ হতে পারবে তত বেশি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারবে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীতন্ত্রের উদ্দেশ্য সাধন করে তখন স্বাভাবিকভাবেই এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে ধীরে ধীরে অদক্ষ ও খুবই ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় এতদিনে আমরা কতটুকু রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পেরেছি তা একটি প্রশ্ন। একাত্তর পরবর্তী এই দীর্ঘ পরিক্রমায় এই ভূখণ্ডের মধ্যে মানুষের মধ্যে ন্যূনতম সামাজিক চুক্তি কী তা নিয়ে ঐকমত্য অর্জন করা যায়নি। নাগরিকরা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবে, রাষ্ট্রের ওপর বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব কতটা হবে সেই বিষয়গুলো যেমন প্রতিনিয়ত অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে অধিকন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা আছে তার ওপর ভিত্তি করে নীতিকাঠামোর নতুন নতুন মানদণ্ড নির্ধারিত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রকে শুধু বলপ্রয়োগকারী একটি সংগঠন হিসেবে দেখা হয় না, এই সময়ে রাষ্ট্রের পরিচয় একই সঙ্গে নিরপেক্ষ ও মানবিক এবং সেবা প্রদানকারী। এই সেবা প্রদান কার্যক্রম নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ যদি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মতবাদ ও ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে তা কোনোভাবেই জনগণকে সেবা প্রদান ও তাদের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখতে পারে না। জনগণের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখতে পারাতেই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের বৈধতা তৈরি হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দ্বার উন্মোচিত হয়। জার্মানির ওয়েস্টফেলিয়া শহরে ১৬৪৮ সালে এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ইউরোপের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে ৩০ বছরের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এর ফলে ইউরোপে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব কমে যায়, ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো সার্বভৌমত্ব অর্জন করে এবং নতুন বিন্যাস লাভ করে যা ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ওয়েস্টফেলিয়ার এই চুক্তি পরবর্তী সময়ে ইউরোপে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার বিন্যাস করে এবং এর ওপর ভিত্তি করে করেই সমতাভিত্তিক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন-স্বার্বভৌম রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। তবে কোনো কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন ইউরোপে আধুনিক রাষ্ট্রের সূচনা হয়েছে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তিরও আগে। খ্রিস্টাব্দ ১০০০ অব্দের পরবর্তী সময়ে যখন থেকে সুসংগঠিতভাবে সামরিক শক্তির বিকাশ ঘটতে থাকল সেগুলোই আধুনিক রাষ্ট্রের সূচনা। যুদ্ধ পরিচালনার খরচ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষেই সম্ভব ছিল। তবে ইউরোপে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের ধাপে ধাপে সামরিকতন্ত্র ও গোষ্ঠীয় গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব যতটা কমেছে ততটাই মানুষের মর্যাদা ও অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তবে তার মানে এই নয় ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সামরিকায়ন করেনি বা তারা ধর্মচর্চা করছে না। এর সবগুলোই করছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের থেকে একধাপ বেশি করছে কিন্তু অন্তত নিজেদের মানুষের মর্যাদা ও অধিকারের বিষয়গুলো তাদের অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দুতেই আছে। এই রাষ্ট্রগুলোকে স্বাধীনতা, সমতা ও সাম্যের আলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতাধীন একটা সীমার মধ্যে নিজ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেখা যায়।
আমাদের মতো দেশগুলো ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে হঠাৎ করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করে। তবে সমস্যা হচ্ছে ইউরোপ যে সময় জুড়ে রাষ্ট্র সম্পর্কিত নিজস্ব চিন্তা ও চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছে সেই সময়ে আমাদের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। রাষ্ট্র সম্পর্কিত নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ও চিন্তার ঐকমত্য কখনো তৈরি হয়নি অধিকন্তু ব্রিটিশরা যখন ভারত ত্যাগ করে তখন সমাজের বিভক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় মূলত ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে। সেই বিভক্তি এখনো চলমান বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পর্যায়ে।
ইউরোপে রাষ্ট্রগুলো যে সময়ে নিজেদের আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করছে, সেই একই সময়েই তারা এশিয়া, আফ্রিকায় ও আমেরিকার দেশগুলোতে উপনিবেশ করে তাদের সম্পদ লুট করেছে। নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে ব্রিটিশের কাছ থেকে ভারত ও পাকিস্তান যখন স্বাধীনতা লাভ করে তখন থেকেই ভারত যতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে যতটা মনোযোগ দিয়েছে তার উল্টোটা হয়েছে পাকিস্তানে। না পেরেছে নিজেদের মধ্যে আধুনিক রাষ্ট্রের আদর্শ ধারণ করতে না পেরেছে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করতে। আমরাও কি এই অবস্থা থেকে খুব ব্যতিক্রম? বলা বাহুল্য প্রথমটি ছাড়া দ্বিতীয় তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তিচুক্তি শুধু জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ তৈরি করেনি অধিকন্তু আইনের শাসন, মানবাধিকারের প্রতি মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর মূলনীতির ওপর ঐকমত্য প্রকাশ করে। এই চুক্তি ধর্মকে রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয় থেকে আলাদা করে এবং ধর্মকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত চর্চার বিষয় হিসেবে নিয়ে আসে।
আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে না পারা যেকোনো দেশের নাগরিকদের জন্য শঙ্কার, আমাদের জন্যও তাই। আর রাষ্ট্রই যদি গড়ে না ওঠে তাহলে সেখানে উন্নয়নের প্রসঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ সুসংগঠিত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান ছাড়া রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা যেমন ব্যাহত হয় পাশাপাশি সব উন্নয়ন সম্ভাবনা দূরীভূত হয়ে যায়। আর এর মানেই হচ্ছে নাগরিক সব অধিকারের অপমৃত্যু এবং দেশের সম্ভাবনার বিনাশ।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com