রোহিঙ্গা সমস্যার কার্যকর সমাধান

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্ররোচনা ও জাতিগত গণহত্যায় সে দেশের রোহিঙ্গারা বছরের পর বছর ধরে জীবন বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হচ্ছে। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে স্মরণকালের নির্মমতম জাতিগত হামলার মুখে অন্তত ৭ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগেও একই ঘটনার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল তারা। ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখে।

মানবিক কারণেই বাংলাদেশ এদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়। তবে অসহায় এই জনগোষ্ঠীর সমস্যার সত্যিকারের সমাধান নিয়ে জাতিসংঘসহ বিশে^র পরাশক্তিধররা কার্যকর তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং ভূরাজনীতির জটিল প্যাঁচে এসব মানুষের ভাগ্য আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ভারত এবং চীন নিজেদের স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। অন্যদিকে, জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো নানা সময়ে অর্থ সাহায্য এবং সমস্যা নিয়ে কথা বললেও এর কোনো সুরাহা করতে পারেনি।

বাংলাদেশ একটা সময় পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে রোহিঙ্গা বাবদ বিপুল পরিমাণ সাহায্য পেয়েছে কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলের হামলার ঘটনাসহ বিশে^র অন্য প্রান্তের সংকটগুলো বিশ^মানবতার মনোযোগ রোহিঙ্গাদের থেকে সরিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গার বোঝা টানতে হচ্ছে, যা দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি সামাজিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। অন্যদিকে, আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে থাকা মানুষগুলোর মানবিক অধিকার সীমিত। কবে নিজেদের বাসভূমে ফিরতে পারবে তারা, নাকি কোনো দিন পারবে না এ অনিশ্চয়তায় কাটছে বছরের পর বছর।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিগত সরকার ছিল স্বৈরাচার। প্রশাসন, পুলিশ ইত্যাদির পাশাপাশি বিদেশি শক্তিধরদের হাত করে চলাই ছিল সেই সরকারের টিকে থাকার উপায়। ফলে বিগত সরকার ছিল কূটনৈতিকভাবে দুর্বল এবং নতজানু। আর তাই, রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশ বিশ^দরবারে উচ্চকিত হতে পারেনি।

কিন্তু এক গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় পতন হয় সেই সরকারের। দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের আরও সব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি তার ঘাড়ে বর্তায় রোহিঙ্গা সমস্যাটিও। আশার কথা, ড. ইউনূস সম্ভবত এ কাজের সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি, কারণ তার মতো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আর প্রভাব এই মুহূর্তে বাংলাদেশিদের মধ্যে আর কারও নেই।

সেই আশার পালে হাওয়া দিয়ে, সম্প্রতি তিনি মিয়ানমারের রাখাইনে বাস্তুচ্যুতদের জন্য জাতিসংঘের মাধ্যমে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং তাদের সহায়তা করার উপায় খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি রাখাইনের বিদ্যমান সংকট সমাধানে একটি ভালো সূচনা হতে পারে এবং বাংলাদেশে হাজার হাজার নতুন শরণার্থীর প্রবেশ ঠেকাতে পারবে। মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার থমাস অ্যান্ড্রুজ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে গত মাসে বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার থমাস অ্যান্ড্রুজ রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধান উপদেষ্টার জাতিসংঘে উপস্থাপিত তিন দফা প্রস্তাবের প্রশংসা করেন। অধ্যাপক ইউনূস রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেন। তিনি হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন ত্বরান্বিত করতে বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ারের সহায়তা চান।

আশা করা যায়, বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ, বিশ্বের অন্য পরাশক্তিধরদের নিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যাটির আশু সমাধান করতে পারবে। প্রধান উপদেষ্টা এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিলে গুরুতর এই মানবিক সমস্যাটির সমাধান হবে বলে আশা করা যায়।