বাংলাদেশে শিক্ষা খাত নিয়ে যা খুশি তাই করা যায়

লেখক ও গবেষক এবং শিক্ষা ও শিশুরক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক রাখাল রাহা। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল। বিশেষ একটি পরিস্থিতির মধ্যে এবার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছে। ফলপ্রকাশের ক্ষেত্রেও উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে। সার্বিক বিষয় নিয়ে এই শিক্ষা অ্যাক্টিভিস্ট কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : বিশেষ প্রেক্ষাপটে এবারের এইচএসসি হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেই অভিঘাত এখনো চলছে। ফলে এবারের ফলাফল প্রকাশে তেমন উত্তাপ, উত্তেজনা নেই। ব্যাপারটি কি আপনার চোখে পড়েছে?

রাখাল রাহা : আসলে আমি নিজেও ভুলে গেছি বা আমার মনেই নেই যে আজ (মঙ্গলবার) কোনো রেজাল্ট ছিল। অফিসে যাওয়ার অনেক পর যখন একজন বলল, আজ না রেজাল্ট দিচ্ছে! আমি বললাম, তাই নাকি, আমি তো কিছুই জানি না। এ রকম আরকি! এ বিষয়ে চারপাশে কাউকে তেমন কিছু বলতেও শুনিনি। ইভেন ফেসবুক খুললেও যে পাসের খবর, জিপিএ দেখা যায় সেটাও সেভাবে দেখিনি। মানে আগে যেমন রেজাল্ট নিয়ে একটা পরিবেশ দেখা যেত, কিন্তু মনে হচ্ছে না যে এবার তার কোনো প্রভাব আছে।

দেশ রূপান্তর : এবার এইচএসসি ফলাফলের বিষয়ে নজরবিহীনভাবে কিছু শিক্ষার্থী সচিবালয়ে ঢুকে পড়েছিল। পরে বিষয় ম্যাপিং করে এবারের ফল তৈরি করা হয়েছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন আপনি?

রাখাল রাহা : বিষয়টাকে আসলে আমি যেভাবে দেখি, যা খুশি তাই করার যেসব খাত আছে আমাদের, বাংলাদেশের শিক্ষা হলো তেমন একটা খাত। এই খাতের সঙ্গে জড়িত আছে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি শিক্ষার্থী। আর এটার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখছি। তারা কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীর চাপে বা বাধ্য হয়ে দিয়েছে, এটা এ রকম না। কারণ, অন্য কোনো খাতে হলে সেটা মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে যদি বলত যে আমাদের এটা করে দাও, তাহলে কর্তৃপক্ষ সময় নিত, কলকারখানার ক্ষেত্রে এমন তো প্রায়ই দেখি। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন করে। এই খাতটা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, কারণ এখানে যা খুশি তাই করা যায়। এই খাতটা যারা পরিচালনা করেন তারা এমনটাই মনে করেন। আর এ কারণেই তারা এ রকম সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। কোনো ধরনের জবাবদিহিতায় তাদের যেতে হয় না।

দেশ রূপান্তর : করোনার পর এই শিক্ষার্থীদের আর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে ফিরে আসা হয়নি। তারা সংক্ষিপ্তভাবে পরীক্ষা দিয়েছে, অটোপাসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে আবার এর ফলে জিপিএ ৫ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। উচ্চশিক্ষায় এর প্রভাব কীভাবে পড়বে?

রাখাল রাহা : উচ্চশিক্ষায় এর প্রভাব তো চরম নেতিবাচকই পড়বে। কারণ আমরা দীর্ঘকাল ধরে দেখে আসছি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে ভর্তি পরীক্ষা হয় সেখানে পাসের হার কম। এ ক্ষেত্রে মূল্যায়ন বা স্টাডি করলে দেখা দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সবারই একটা মত যে শিক্ষার মান ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে অনেক নেমে গেছে, যার ফলে এটা হচ্ছে। এটার একটা এই শর্ট সিলেবাস। এছাড়া আগেও যে পরীক্ষাগুলো হয় সেটার কারণেও এটা হয়। একটা সময় ব্যাপকভাবে এ রকম ঘটেছিল। তখনো কিছু প্রচেষ্টা ছিল কোনো কোনো মহলে যে না এতটা খারাপ করতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু এখন এমন যে, শিক্ষার্থীদের নিয়ে যা খুশি করা যাচ্ছে। করোনার অজুহাতে সারা দুনিয়ার এমন কোনো দেশ নেই যে, যেখানে এমনভাবে অটোপাস দেওয়া হয়েছে। আমরা করোনার মধ্যে ছিলাম কিন্তু আমরা চরমভাবে এফেক্টেট ছিলাম না। এফেক্টেট কান্ট্রিগুলো কী করেছে পরীক্ষার ক্ষেত্রে? সেটা দেখলেও বোঝা যাবে যে, আমাদের সিদ্ধান্তগুলো কী পরিমাণ ভুল ছিল। এটা ছিল ইচ্ছাকৃত; একধরনের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এখন পর্যন্ত আমরা ওই শর্ট সিলেবাসের প্রবাহের মধ্যেই আছি। এটা দুনিয়ার আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।

দেশ রূপান্তর : যে শিক্ষার্থীরা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস কিংবা অটোপাসের ভেতর দিয়ে আসছেন, তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বা ঘাটতি ধরিয়ে দিয়ে শুধরে নিতে বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে কি আলাদা কিছু চিন্তা করা যায়? কারণ সবার তো আর উচ্চ বা বিশেষায়িত শিক্ষার দরকার নেই, কিন্তু যাদের দরকার তাদের তো সিলেবাসের ঘাটতি পূরণ করা লাগবে।

রাখাল রাহা : আমরা আসলে ওই রকম স্মার্ট কান্ট্রি না, স্মার্ট ইনস্টিটিউশন না। যে এক জায়গায় একটা ইচ্ছেকৃত ক্ষতি করে দিলে আরেকটা প্রতিষ্ঠান সেই ক্ষতিটা কাটিয়ে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেবে, এ রকম রাষ্ট্র আমরা না। আমাদের রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই এমন না। বরং রাষ্ট্রের কোনো একটা জায়গায় কোনো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তাহলে সম্ভাবনা তৈরি হয় যে পরে যে কোনো জায়গায় গিয়ে সেই ক্ষতির কারণে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার। সুতরাং, এটা একেবারেই এখানে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

দেশ রূপান্তর : এই শিক্ষার্থীরা তো ইউনিভার্সিটিতে যাবে এই সমস্যা নিয়ে। প্রফেশনাল জায়গায় গিয়েও সমস্যায় পড়বে...।

রাখাল রাহা : এখানে ধারণা আছে যে সবাইকে উচ্চশিক্ষায় পৌঁছিয়ে দিয়ে বেকারত্বের হারটাকে মিনিমাম রাখা। এটা তো শিক্ষার মূল স্ট্র্যাটেজিক্যাল জায়গায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্ট্র্যাটেজিটা হচ্ছে, উচ্চশিক্ষায় সবাইকে যেতে দাও ও বেকারত্বের হার মিনিমাম রাখো এবং অন্যান্য সেক্টরের মধ্যে অন্য পলিসি তৈরি করার ক্ষেত্রে এটা যেন সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সুতরাং এখানে কে ঘাটতি নিয়ে উচ্চশিক্ষায় গেল না গেল, তার সার্টিফিকেট পাওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো অসুবিধা উচ্চশিক্ষায় যেন না হয় সেই বন্দোবস্ত আসলে ইনস্টিটিউশনগুলোর মধ্যে আছে। সেটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ও পাবলিক ইউনিভার্সিটিতেও কমবেশি আছে এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে আছে বলে যারা কাজ করেন তারা বলেন। সুতরাং এই যে ঘাটতি, এই ঘাটতি আসলে তাদের ক্ষেত্রে ওরকম কোনো সংকট তৈরি করবে বলে আমার মনে হয় না। যদি না আমি সত্যিকার অর্থে শিক্ষাকে সেভাবে ভেবে থাকি। এই ছেলেমেয়েগুলো আসলে এডুকেশন নামে যা পেল সেটা আসলে তাদের সঙ্গে প্রতারণা। চাকরির বাজারে গিয়ে তারা এই এডুকেশন নিয়ে কী করবে সেটা তারাও যেটা জানে আর কর্র্তৃপক্ষও জানে। এখানে জব মার্কেটগুলোতে যাওয়ার জন্য কতটা ভূমিকা রাখে এই হায়ার এডুকেশন আর কতটা কেবল ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটের জন্য?

দেশ রূপান্তর : জুলাই অভ্যুত্থানে এই পরীক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছেন। তারা অনেক সহিংসতার ভেতর দিয়ে যেমন আসছেন, তেমনি তারাও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখাতে তীব্র হয়ে উঠেছেন। যেমন, অটোপাসের দাবিতে সচিবালয়ে চলে যাওয়া। তাদের মানসিক জায়গাটা স্বাভাবিককরণে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়?

রাখাল রাহা : আপনি এখন যেটা বললেন সেটা হচ্ছে যে একটা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিংবা এটা প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যেই পড়ে; যে, হ্যাঁ, ঠিক আছে, তারা একটা বড় অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গেছে, তারা ট্রমাগ্রস্ত আছে। এই যে আন্দোলনের পরে কয়েকজন বা কয়েকশ শিক্ষার্থী সচিবালয়ে গিয়ে চাপ দিল আর তারা সিদ্ধান্তটা নিল। তো এই কয়েকশ শিক্ষার্থী কি সারা দেশের ২০ লাখ শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করে? তা তো করে না। যদি না করে তাহলে তারা কীভাবে এই সিদ্ধান্তটা নেয়। এটা তো একেবারেই নিতে পারে না। দ্বিতীয়ত হলো যে, তারা গিয়ে দাবি করল আর তৎক্ষণাৎ একটা পরিপত্র পেয়ে গেল! এখন দাবি মানার মতো রাষ্ট্রব্যবস্থা, সরকারব্যবস্থা আমরা কবে থেকে অর্জন করলাম? যেখানে ন্যায্য একটা দাবিতেও পুলিশের গুলি খেয়ে মরতে হয়, সেখানে এটা কীভাবে ঘটল? আসলে বিষয়টা একেবারেই তা না। যদি তারা মনে করত হ্যাঁ, সিচুয়েশনটা খারাপ তাহলে আমাদের করণীয় কী? একেকটা বোর্ডে সমানসংখ্যক পরীক্ষা হয়নি। কোনো বোর্ডে ৩টা হয়েছে কোনো বোর্ডে হয়েছে ৭টা হয়েছে; কোনো বিভাগে ৫টা দিতে পেরেছে, কোনোটায় ৪টা দিতে পেরেছে। এই ম্যাপিংটা কীভাবে করা সম্ভব? হয়তো করা সম্ভব একভাবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তাৎক্ষণিক তারা দেয় কী করে!

দেশ রূপান্তর : এই শিক্ষার্থীরা তো বিপদের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। মহামারী, অভ্যুত্থান। আবার মানসিক আঘাতের জায়গাটাও আছে, আবার বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার দুঃসাহসেরও প্রতিক্রিয়া আছে। এই শিক্ষার্থীরা, ইন্টার পড়া, স্কুলে পড়া বাচ্চা ছেলেরা বলছিল তারা দেশের জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত। এই আবেগ তো সমাজে প্রায় অনুপস্থিত ছিল অনেক দিন। কিন্তু যে অবস্থা, তারা তো হতাশ হয়ে পড়বে কিছুদিনের মধ্যেই।

রাখাল রাহা : আমি বলব যে এই আন্দোলনকে, মানে অটোপাসের দাবিকে তো আমাদের চ্যালেঞ্জ করতে হবে। এ জায়গায় কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু কথা হলো তাদের যে সহিংসতার ট্রমা, সেটা থেকে বের করতে হবে, এটা আমাদের দায়িত্ব। এটা থেকে বের করার জন্য পরীক্ষা দেওয়াটাও যে একটা উপায়। পরীক্ষা যে আন্দোলন-সংগ্রামের ট্রমা থেকে বের করার পথ পদ্ধতি হতে পারে এবং এর মধ্যে তাদের নিয়ে যাওয়াটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল। যে রাষ্ট্রের বিপদে তুমি রাস্তায় নেমেছ এবং সেই বিপদ থেকে তুমি ফল পেয়েছ। এর মানে এই নয় যে, তুমি একটা অন্যায্য দাবি করবে এবং সেটা পূরণ করার মাধ্যমে তুমি নিজেই ভবিষ্যতে আরও ট্রমার মধ্যে পতিত হবে। এটা করলে আপাতত তুমি ট্রমা থেকে বের হলেও ভবিষ্যতে তোমার আরও বড় ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সারা জীবন তোমার শুনতে হবে তুমি তো অটোপাস।

দেশ রূপান্তর : আমরা হতাশ মুক্তিযোদ্ধা দেখেছি, এখন কি অভ্যুত্থানকারী হতাশ তরুণদের দেখব?

রাখালা রাহা : না, সেটা শুধু শিক্ষার জন্য তারা হতাশ অভ্যুত্থানকারী হবে, তা না। কারণ যদি এই অভ্যুত্থানের ফলে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা আমরা চাই সেটা না হলে, বা রাষ্ট্র যদি সাধারণ অভ্যুত্থানকারীদের চাওয়াটা পূরণ করতে না পারে, তাহলে তো অধিকাংশ মানুষ মনে করবে এটা তো মুক্তিযুদ্ধের মতোই হলো। তাহলে তারা বলবে যে, হ্যাঁ, একই তো, একই কা- হলো, কোনোকিছুই আমরা চেঞ্জ পেলাম না। সুতরাং তারাও হতাশার দিকে যেতে পারে। আর এই প্রজন্ম পরীক্ষা না দিয়ে পাসের যে ট্রেন্ড গড়ে তুলল তাদের তো এটার দিকেই ঠেলে দেওয়া হলো। এমন হলো ব্যাপারটা যে, তুমি একটা ন্যায্য আন্দোলন করলে, একটা অন্যায্য দাবি তোমাকে পূরণ করে দেওয়া হবে। যেটা শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পর ৭২’র পরীক্ষার মাধ্যমে। যার ফল এখনো জাতি বহন করছে। শিক্ষার এই ধরনের সিদ্ধান্তের কুফল সেটা তো আসলে শত বছর থেকে চলতে থাকে ভেতরে ভেতরে।

দেশ রূপান্তর : অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।

রাখাল রাহা : আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়