‘চলে পথে অনশনক্লিষ্ট ক্ষীণ-তনু,/কী দেখি বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রু-ধনু,/দু’নয়ন ভরি, রুদ্র হানো অশ্রুবান/ আসে রাজ্যে মহামারী দুর্ভিক্ষ তুফান/প্রমোদকানন পুড়ে, উড়ে অট্টালিকা/তোমার আইনে শুধু মৃত্যু-দণ্ড লিখা!’ নজরুলের দারিদ্র্য কবিতার এই লাইনগুলো পড়লে, দারিদ্র্যের ভয়াল রূপ টের পাওয়া যায়। অথচ এই কবিতার প্রথম লাইনে ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান, দানিয়েছো মোরে খ্রিস্টের সম্মান’ এই লাইনটাই বেশি পরিচিত। মানবসভ্যতার ভয়ালতম ঘাতক দারিদ্র্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার রোমান্টিকতায় আমরা বুঁদ হয়ে যাই প্রথম লাইনটা পড়ে। দুনিয়া এত আধুনিক হচ্ছে, পৃথিবী শুষে নিয়ে প্রকৃতিকে নিংড়ে মানুষ সম্পদ গড়ছে অথচ দারিদ্র্য বাড়ছেই। একদিকে ধনী আরও বেশি ধনী হচ্ছে, দুনিয়া ছাড়িয়ে মঙ্গল গ্রহে ভ্রমণের স্বপ্ন দেখছে। অন্যদিকে দরিদ্ররা আরও বেশি দরিদ্র হচ্ছে। সামান্য খাবার আর পরিষ্কার পানির অভাবে কোটি কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রবৃদ্ধির যতই বড়াই করুক, এই পৃথিবীতে এখনো সবচেয়ে বড় অভিশাপের নাম দারিদ্র্য।
প্রতি বছর দারিদ্র্যের এই খতিয়ান প্রকাশ হয় আর বছরান্তে এই হিসাব আরও বেশি রূঢ়, আরও বেশি বেদনার্ত হয়ে ওঠে। পরিসংখ্যানের কালির আড়াল থেকে অস্ফুটে উচ্চারিত হয় মানুষের অসহায়ত্বের রক্তমাখা গল্প। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে জাতিসংঘের বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্যসূচক-২০১৪। এই সূচকে যথারীতি ফুটে উঠেছে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার উপাত্ত। ওই প্রতিবেদন মতে, সবমিলিয়ে বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে, যার বেশিরভাগই আফ্রিকা-দক্ষিণ এশিয়ায়। সেই সূচক থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে ৪ কোটি ১৭ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে অতি মানবেতর জীবনযাপন করছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য পরিস্থিতি বুঝতে জাতিসংঘ বিশ্বের ১১২টি দেশের ৬৩০ কোটি মানুষের ওপর গবেষণা করেছে। তাতে ২০২-২২৩ বছর পর্যন্ত এক দশকের বেশি সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবনযাপনের মানকে চলক হিসেবে ধরা হয়েছে। জীবনযাপনের মানের মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত আবাসন, পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, ভোজ্যতেল ও পুষ্টির মতো মৌলিক মানবিক সেবাগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি কেমন, তা বিবেচনা। জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির করা বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক-২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। এক্ষেত্রে দারিদ্র্য সূচকে বাংলাদেশের মান ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ। আর শিক্ষায় ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ ও স্বাস্থ্যে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের চরম দারিদ্র্যে অতি মানবেতর জীবনযাপন ৪ কোটি ১৭ লাখ মানুষ।
দারিদ্র্যের কারণে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় শিশুদের। বিশ^ব্যাপী শিশুদের প্রতি চারজনের একজন, প্রায় ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে আছে। সংখ্যায় হিসাব করলে তা ৫৮ কোটি ৪ লাখ। দারিদ্র্যের একটি বড় কারণ যুদ্ধ। সারা দুনিয়ায় মোট ১১০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে বলে জাতিসংঘের সূচকটির বরাতে জানা গেছে। এর অর্ধেকই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে। এসব দেশে পুষ্টি, বিদ্যুৎ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। ইউএনডিপির আছিম স্টেইনার বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতগুলো আরও তীব্র ও বহুমুখী হয়েছে, মৃত্যুর সংখ্যা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং জীবনযাত্রা ও জীবিকার ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটেছে। বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির অধিক হলেও এই সংখ্যা প্রতিবেশী ভারতে অনেক বেশি। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটির মধ্যে ২৩ কোটি ৪০ লাখই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভারতের পরে রয়েছে পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। দারিদ্র্যে দিন কাটানো ১১০ কোটি মানুষের প্রায় অর্ধেক এই পাঁচ দেশের।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দারিদ্র্যের সংকট নিরসন করা অসম্ভব। সম্পদ বাড়লেও বণ্টনের অসাম্যের কারণে দারিদ্র্য বরং আরও বাড়বে। উপরন্তু সম্পদ বাড়াতে গিয়ে প্রাণ-প্রকৃতির যে ক্ষতি হবে তার সবচেয়ে বড় শিকারও হবে চরম দরিদ্ররাই। দারিদ্র্য একটি বৈশি^ক সমস্যা। একে নির্মূল করতে হলে বণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া অন্য উপায় নেই।