একটা হরিয়ানা দিয়ে দেখলে হবে না

হরিয়ানা রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপির আশাতীত সাফল্যের পর পরই যেভাবে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাঙ্গপাঙ্গরা উদ্বাহু নেত্য করছেন, তাতে তাদের ভেতরে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, সেটাই বরং খোলাখুলিভাবে সামনে এসেছে। এটা ঠিকই যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কারণেই মূলত জেতা ম্যাচ কংগ্রেস হেরেছে। যা সংশোধন না করলে আগামী দিনে ফের কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করা কংগ্রেসের পক্ষে কঠিন হবে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দলাদলি অবশ্য নতুন নয়। প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই গোষ্ঠী-কোন্দল দলের নিত্যসঙ্গী। স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী বনাম সুভাষ চন্দ্র বসু বা নেহরুর সঙ্গে বল্লভভাই প্যাটেলের বিবাদ তো সর্বজনবিদিত। ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে গেছে। ফলে কংগ্রেস নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী দিনে চরম দক্ষিণপন্থি শক্তির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে, এরকম স্বপ্ন সম্ভবত রাহুল গান্ধী নিজেও করেন না। কংগ্রেস আদ্যন্ত একটি সেন্ট্রিস্ট দল। বিজেপির তুলনায় লিবারেল, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি।

কংগ্রেসের সাফল্য-ব্যর্থতা যত না নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির ওপরে নির্ভর করে, তারচেয়ে বেশি করে ভারতের জনগণ কতটা গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ থাকতে পছন্দ করেন তার ওপর। কংগ্রেসের তুরুপের তাস বিজেপির চরম মনুবাদী, ধর্মীয় বিদ্বেষী রাজনীতির বিপক্ষে অজস্র মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। লড়াইটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদ বনাম অব্রাহ্মণ্যবাদের। হরিয়ানা গো বলয়ের রাজ্য এটা ভুললে চলবে না। বিজেপির প্রচারে এবার বিরাট ভূমিকা ছিল সংঘ পরিবারের। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে আরএসএসের বিবাদ নরেন্দ্র মোদিকে বিপদে ফেলেছিল। দুপক্ষ বুঝতে পারে, দিনশেষে দুপক্ষের দুপক্ষকে দরকার, তখনই পরস্পর ফের জোট বেঁধে লড়াইতে ফিরতেই মনুবাদী রাজনীতি সাফল্যের মুখ দেখল হরিয়ানায়।

পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে আজও গ্রাম ভারতে ভোট হয় জাতপাতের নিরিখে। হরিয়ানায় জাঠেরা প্রভাব-প্রতিপত্তিতে চিরকালই অন্যান্য জাত গোষ্ঠীর থেকে এগিয়ে। অর্থনীতি, রাজনীতি সবদিক দিয়েই জাঠেদের রমরমা অন্যদের মাথাব্যথার কারণ। ফলে কংগ্রেসের জাঠেদের প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব এবার তাদের বিপদে ফেলেছে। দলিতদের একাংশ এই প্রথম কংগ্রেসের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কংগ্রেস নেত্রী কুমারী শৈলজা দলিত। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে স্বয়ং দলিত সম্প্রদায়ের। দলিত ভোট যে সরছে এটা কংগ্রেসের আগেই আন্দাজ করা উচিত ছিল। তারা আন্দাজ তো করেইনি, বরং সেভাবে শৈলজাকে ভোটযুদ্ধে সামনেই আনেনি। ফলে মাশুল গুনতে হয়েছে দলকে। আসলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ক্ষোভকে হাতিয়ার করে খানিকটা স্টেজে মেরে দেওয়ার মানসিকতাই কাল হলো কংগ্রেসের। অন্যদিকে হরিয়ানা-যুদ্ধে সূচ্যগ্র মাটি ছাড়তে নারাজ ছিল বিজেপি। হেন কোনো অস্ত্র ছিল না যা জিততে বিজেপি ব্যবহার করেনি।

পাঞ্জাব হরিয়ানায় গুরু নানক প্রবর্তিত শিখ ধর্মের বাইরে, বেশ কয়েক দশক ধরে অজস্র ছোট ছোট ডেরার প্রভাব বেড়েছে। শিখ ধর্ম নিরাকারের আরাধনা করে। গুরু নানকের মূল মন্ত্র ছিল জীবে প্রেম। পরবর্তী সময়ে অবশ্য শিখদের রাজনৈতিক সংগঠন আকালী দলের মধ্যে সশস্ত্র রাজনীতির প্রবণতা বাড়তে থাকে। শিখদের মধ্যেও তাদের সাম্যবাদী মতাদর্শের স্খলন দেখা দিতে লাগল। দলের মধ্যে দলিতদের অবহেলা বাড়তে থাকার সুযোগ নিতে লাগল বিভিন্ন ডেরার কর্তারা। ডেরা নিরাকার চিন্তা পরিহার করে প্রতিষ্ঠানের কর্তারাই স্বয়ং ঈশ্বরের দূত বলে ঘোষণা করে সাধারণ জনতাকে কাছে টানতে লাগল। ডেরা অনুসারীদের ভেতর প্রাধান্য বাড়ল দলিত ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা রিফিউজিদের। এত কথা উঠছে যে জন্য তা হলো কয়েক বছর আগে অত্যন্ত প্রভাবশালী ডেরাদার রাম রহিমকে পুলিশ জেলে পাঠিয়েছিল একাধিক জঘন্য মামলায়। তার মধ্যে রেপ কেস ছিল পয়লা নম্বরে। কিন্তু কোন কৌশলে জানি না, তিনি এবারের নির্বাচনের আগে অজ্ঞাত কারণে জামিন পেয়ে বাইরে এলেন। এবং সরাসরি বিজেপিকে ভোট দিতে লাখ লাখ ভক্তকে নির্দেশ দিলেন। একই সঙ্গে বিজেপি দলিত নেত্রী মায়াবতীকে কংগ্রেসের চিরায়ত ভোট ব্যাংককে ভাঙতে কাজে লাগাল। টাকা, মাফিয়া, রাজনৈতিক কূটকৌশলের জোরে বিজেপি হরিয়ানায় বাজিমাত করলেও সে তার অজেয় ভাবমূর্তি ফিরে পেয়েছে বলে যারা মনে করছেন, আমি অন্তত তাদের দলে নাম লেখাতে পারলাম না। দুঃখিত।

কংগ্রেসের আপাত পরাজয়ের মধ্যেও মাথা উঁচু করে বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়েছেন কুস্তির সোনার মেয়ে বিনেশ ফোগত। যিনি ও তার অনেক সতীর্থ বিজেপি নেতা ও কুস্তি ফেডারেশনের বাহুবলী কর্তা ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনলেও বিচার পাননি। তার এই জয় নিঃসন্দেহে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষে লজ্জাজনক। তবে বিজেপির পক্ষে আরও লজ্জার জম্মু কাশ্মীরে পর্যুদস্ত হওয়া। ভারতের অধিকাংশ মোদিভক্ত মিডিয়া হরিয়ানাকে নিয়ে মাতামাতি করছে, আদতেই কাশ্মীরের মানুষের হাতে চপেটাঘাত আড়াল করতে। কাশ্মীরের পরাজয় বস্তুত কেন্দ্রীয় নীতির বিরুদ্ধে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাখ্যান। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরল ন্যাশনাল কনফারেন্স। দলের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লাহ সম্পর্কে যে ঘৃণা জনমনে ১৯৪৭ সাল থেকেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি চারিয়ে দিতে সক্রিয়, তা যে ভিত্তিহীন তা যেকোনো ইতিহাসের ছাত্র নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই জানতে পারবেন। মনে রাখতে হবে শেখ সাহেব ভারতের প্রথম ভূমি সংস্কারের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ন্যাশনাল কনফারেন্সের পতাকা লাল সবুজ। যা শ্রমিক কৃষকদের প্রতি নিবেদিত। এক হিসেবে এবারের নির্বাচনে ন্যাশনাল কনফারেন্সের জয় কেন্দ্রীয় সরকারের ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদ বলেও রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের দাবি। এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কাশ্মীর পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পাক তার পক্ষে যে অধিকাংশ জনগণ তা ভোটের ফলেই পরিষ্কার।

কাশ্মীরের জনতার বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে দ্বিধা করেনি বিজেপি সরকার। ওপর ওপর গণতান্ত্রিকব্যবস্থা থাকলেও আসলেই কাশ্মীর হয়ে উঠেছিল পুলিশি স্টেট। যেখানে তুচ্ছ কারণেও সমস্যায় পড়তে হতো জনতাকে। এবারের নির্বাচনের আগে আসন পুনর্বিন্যাস করার নামে জম্মুতে ৬টি ও কাশ্মীর ভ্যালিতে ১টি আসন বাড়িয়েছিল কেন্দ্র। জম্মুতে খোলাখুলিভাবে সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের আওয়াজ তুলেছিল বিজেপি। বাড়তি ৬টি আসনে ও অন্যত্র কাজে আসবে ভেবে। বিজেপি সবসময় প-িতদের দাবার বোড়ে করে বাজিমাত করতে চায়। আসন পুনর্বিন্যাস বা প-িত ইস্যু সামনে রেখে জম্মু বিজয়ের ইচ্ছে কোনো ক্ষেত্রেই মনস্কামনা পূরণ হলো না কেন্দ্রীয় শাসকদের। কাশ্মীর তাদের পথের কাঁটা হয়েই রয়ে গেল।

আসলে ভারতের সাধারণ লোক বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পছন্দ করে না। ভারতের অধিকাংশ লোক স্বৈরতন্ত্র নয়, পছন্দ করেন গণতন্ত্র। অতিকেন্দ্রিকতা না, তাদের সমর্থন দেশের ফেডারেল কাঠামো, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি। ঠিক সেটাই রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ও অন্যান্য বিজেপিবিরোধী দলগুলোর জোরের জায়গা। ফলে একটা হরিয়ানা দিয়ে দেখলে হবে না। আপাতত তাকিয়ে থাকব মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খ-ের দিকে। বিশ্বাস করি, মনুবাদ নয়, সেখানকার মানুষ ভোট দেবে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে।

বিহার ঝাড়খণ্ডে একটা কাহাবৎ বা প্রবাদ আছে- যিসকি লাঠি উসকে ভাইষ, অর্থাৎ লাঠির জোর যার, মহিষ তার। কয়েকদিন আগে ঝাড়খন্ডের এক ছোট শহরে দুর্গাপূজার ভাসানে দেখি, আরএসএস পরিচালিত ক্লাব তরোয়াল নিয়ে নাচানাচি করছে। কিছুক্ষণ বাদে দেখি আরও আরও যুবক ছুটে আসছে লাঠি নিয়ে। লাঠি তরোয়ালকে কোণঠাসা করে দিল মুহূর্তে। শুনলাম, লাঠি আসলে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার। মুক্তি মোর্চা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইনডিয়া’ জোটের শরিক। জনসমর্থন আর সাহস না থাকলে সংঘ পরিবারের দাপট রোখা কঠিন। লাঠির তেজ দেখে বুঝলাম বিরোধী শক্তি এখন আর মহাপরাক্রমশালী শাসকের ভয়ে কুঁকড়ে নেই। চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা তাদের হয়েছে।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com