গণরুম গেলেও সংকট যায়নি

আবাসিক হলের গণরুমে থাকা ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের (জাবি) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ও বীভৎস এক অধ্যায়। হলগুলোয় ক্ষমতাসীন দলের লেজুড় ছাত্রসংগঠনের প্রভাব খাটিয়ে চারজনের কক্ষ একজন বা দুজনের দখলে রাখা, আসন বণ্টনে তাদের কর্র্তৃত্ব এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষাজীবন শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের অবস্থানের ফলে সৃষ্টি হতো কৃত্রিম আসনসংকট। নথিপত্রে শতভাগ আবাসিক লেখা থাকলেও ‘গণরুম সংস্কৃতি’ ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা। গণরুমে গাদাগাদি করে চারজনের কক্ষে ৮ থেকে ২০ জন, দুজনের কক্ষে ৪ থেকে ১০ জন করে থাকতে হতো। এই দুর্ভোগ বাদেও ছিল ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। গত ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব অপসংস্কৃতিও দূর হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ আবাসন সুবিধা ও পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গতকাল রবিবার থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হয়েছে। এর আগের দিন সকাল থেকেই হলে উঠতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ১১টি ও ছাত্রীদের ১০টি হল রয়েছে। এর মধ্যে নবনির্মিত ছয়টি হলের কোনোটিতেই গ্যাস সংযোগ নেই। ফলে ওই হলগুলোয় ডাইনিং (৩০ টাকা মূল্যের কুপন কেটে খাবার খেতে হয়) চালু হয়নি। এর মধ্যে চারটি হলে গ্যাসের সিলিন্ডার দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করে ক্যানটিন চালু করা হয়েছে। তবে সিলিন্ডার গ্যাসে খরচ বেশির অজুহাতে খাবারের দাম বেশি রাখার অভিযোগ রয়েছে। নবনির্মিত বাকি দুটি হলের মধ্যে সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল ও বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলে ডাইনিং-ক্যানটিন কোনোটাই চালু হয়নি। ফলে ওই দুই হলের শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য পাশের হলে গিয়ে বা বাইরের খাবারের দোকান থেকে তুলনামূলক বেশি দামে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া ওই দুই হলে এখন পর্যন্ত ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়নি। এর বাইরে নতুন ছয়টি হল বাদে কয়েকটি হলে নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত চেয়ার ও টেবিল নিশ্চিত করতে পারেনি হল কর্র্তৃপক্ষ। ফলে পড়াশোনাসহ ইন্টারনেটনির্ভর কাজগুলো করতে বিড়ম্বনায় পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।

বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হুমাইরা নূর বলেন, ‘হলে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়নি এবং মোবাইল ইন্টারনেটও হলের ভেতরে কাজ করে না। হল চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলে ক্যানটিন চালু করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। আশপাশে খাবারের দোকান না থাকায় খাবার খেতেও অসুবিধা হচ্ছে। এ ছাড়া হলে পরিশোধিত পানি এবং শৌচাগারে বদনা ও গোসলখানায় ছিটকিনি নেই।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হলগুলো থেকে গণরুম বিলুপ্ত করেছি। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একক আসন দেওয়া হয়েছে। গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। নতুন যে দুটি হলে ক্যানটিন চালু হয়নি এবং ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়নি, ওই হল দুটিতে এক বা দুদিনের মধ্যে ক্যানটিন চালু হবে। এ ছাড়া ইন্টারনেট সংযোগের কাজ চলছে, দ্রুতই শেষ হবে আশা করছি। শিক্ষার্থীরা যদি বাকি কোনো সমস্যায় পড়ে, আমরা তা নিরসন করব।’

এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, নবীন শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ হলে প্রথম দিনেই আসন পাবে, এটা তাদের অধিকার। তার প্রশাসন আবাসিক হলে এবং অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোতেও শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে আন্তরিকভাবে কাজ করবে।