‘বৈষম্যহীন ফল’!

আমাদের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে দেখা যাবে, সময় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন সময় কিছু ইস্যুতে আন্দোলন হয়েছে। সেগুলোর অধিকাংশই ছিল সমষ্টিগত। যেখানে শিক্ষার্থীদের গুরুতর সমস্যা এবং জাতীয় কিছু সমস্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল। যা শিক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে এগিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। ন্যায়-নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে যে শিক্ষার্থী, তাদের মধ্য থেকেই উঠে আসবে ভাগ্য পরিবর্তন কারিগর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে ছাত্র সমাজের ভূমিকা অগ্রগণ্য। সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে সব শৃঙ্খল, অন্যায়-অবিচার ও স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তির সূতিকাগার হয়ে উঠেছে ছাত্র আন্দোলন। পাকিস্তানের সময় থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। যেগুলো মূলত ছিল শিক্ষার্থী এবং জনবান্ধব। তার অধিকাংশই চূড়ান্ত পর্যায়ে সফল হয়েছে।

চলতি বছর ৫ আগস্ট হয় গণ-অভ্যুত্থান। সরকারের পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপর থেকে বিভিন্ন দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে ‘বৈষম্য’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এবার এইচএসসির ফলাফলে ‘বৈষম্যের’ অভিযোগ তুলে ৭টি শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা সব বিষয়ে ‘সাবজেক্ট ম্যাপিং’ করে এইচএসসির ফল মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছে। বলছে যেসব বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে সেগুলোর খাতার মূল্যায়ন নয়, সাবজেক্ট ম্যাপিং করতে হবে। ‘এইচএসসি ব্যাচ ২৪’ ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন হয়। ‘ইচ্ছে করে ফেল’ করানো, খাতা যথাযথ মূল্যায়ন না করা এবং ইংরেজি বিষয়ে একচেটিয়া ফেল করানোরও অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা।

রবিবার সকাল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, বরিশাল, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সামনে এবং ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ করেছে তারা। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছে, যেসব বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে সেগুলোর খাতার মূল্যায়ন নয়, সাবজেক্ট ম্যাপিং করতে হবে। ‘ইচ্ছে করে ফেল’ করানো, খাতা যথাযথ মূল্যায়ন না করা এবং ইংরেজি বিষয়ে একচেটিয়া ফেল করানোরও অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। এসএসসির সব বিষয় ম্যাপিং করে ‘বৈষম্যহীনভাবে’ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের দাবিতে একদল শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ-অবরোধের মুখে রবিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার। সোমবার চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন। এরপর গতকাল সকালেই চেয়ারম্যানের পদ থেকে প্রত্যাহারের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে কোনো সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব কি না? আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছে, প্রকাশিত ফল ‘বৈষম্যমূলক’। তারা সব বিষয়ের ওপর সাবজেক্ট ম্যাপিং করে ফল চায়। এসএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে সাবজেক্ট ম্যাপিং করার দাবি তাদের। তবে এ রকম দাবি জানানো যেতেই পারে। কিন্তু এই সমস্ত দাবি পূরণে কাউকে জিম্মি করে আদায় করা কতটা যৌক্তিক? শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য বুমেরাং হতে পারে।  

বর্তমানে ‘বৈষম্য’ শব্দটি সমাজের অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই শব্দটি ব্যবহার করে কেউ কেউ নিজস্ব অবস্থানে থেকে গোষ্ঠীস্বার্থে আন্দোলনে যাচ্ছে। বর্তমানে আন্দোলনের ধরন ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের পদ্ধতি কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা বিবেচনা করতে হবে। একইসঙ্গে যে বিষয় তারা উল্লেখ করেছে, তা বিশ্লেষণ করতে হবে গভীরভাবে। দেখতে হবে, প্রকৃত অর্থেই কোনো বৈষম্য হয়েছে কি না? জরুরি বিবেচনায় শিক্ষা উপদেষ্টাকেই এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য শেষ পর্যন্ত যেহেতু তাকেই জবাবদিহি করতে হবে, তাই কোনো সময়ক্ষেপণ না করে  দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। যেসব বিষয়ে সরকারের বর্তমান ব্যস্ততা, সেই পথে বাধা সৃষ্টি করা সমীচীন হবে না। এইচএসসির ফল হোক বৈষম্যহীন। কারও মধ্যেই যেন কোনো ধরনের সন্দেহ বা ক্ষোভ না থাকে।