অভ্যুত্থানের প্রকৃত প্রাপক কে?

‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/ আজ জেগেছে এই জনতা, এই জনতা...।’

সলিল চৌধুরী এই গণসংগীতে যে জনতার কথা বলেছেন তারা আসলে কারা? ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক দল ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সদস্য হিসেবে গ্রামেগঞ্জে অধিকারবঞ্চিত, শোষিত মানুষকে ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতেই লেখা এই গান। তার মানে কি বিচারপতি জনতার অন্তর্ভুক্ত নন? জনতার কাতারে দাঁড়াতে গেলে পেশা, শিক্ষা, আর্থ-সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলো নির্ণায়ক হবে?

ইংরেজি সাবজেক্ট শব্দটির বাংলায় নানা অর্থ হতে পারে তবে এ লেখার জন্য প্রাসঙ্গিক অর্থগুলো হতে পারে কর্তা, আত্ম, অধীন এবং নাগরিক। এই সাবজেক্টের ক্রমাগত বিনির্মাণ ঘটতে থাকে। ফরাসি তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো যেমনটা বলছেন, যে কোনো উত্তর উপনিবেশিক সাবজেক্টের বিনির্মাণ প্রক্রিয়া এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স বা জ্ঞানগত সহিংসতানির্ভর। উপনিবেশিতের সব লব্ধ জ্ঞান মুছে ফেলার মাধ্যমেই ঔপনিবেশিকের জ্ঞান প্রতিষ্ঠা পায় এবং জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের বিচারেই ঔপনিবেশিক শাসক ন্যায্যতা খুঁজে নেয়। ফুকো বলছেন, ‘একঝাঁক জ্ঞানকে তারা নিজেদের কাজের অযোগ্য ঘোষণা করেছেন যথেষ্ট নয় বা অপ্রতুল ব্যাখ্যার কথা বলে : সরল জ্ঞান, স্তরবিন্যাসের একদম নিচের দিকে অবস্থিত, চেতনা কিংবা বৈজ্ঞানিকতার আবশ্যিক মাত্রার নিচে।’

ক্ষমতার লড়াইয়ে ন্যায্যতার এই খেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স বা জ্ঞানগত সহিংসতা এক্ষেত্রে আধিপত্যবাদী বয়ান প্রতিষ্ঠার যন্ত্র। সাবজেক্ট যার অর্থ এক্ষেত্রে হতে পারে যেকোনো ব্যবস্থার অধীন বা নাগরিক তার বিনির্মাণ বা সংজ্ঞায়নও এই প্রক্রিয়ার অংশ, যা ঘটমান বর্তমান। ফলে এই সাবজেক্টের নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সংকল্প বা আর্থ-সামাজিক বিচরণক্ষেত্র নেই। তার এজেন্সি বা কর্র্তৃত্ব তাহলে কোথায়?

জনতা নামক এই চেহারাবিহীন, নামবিহীন মানবশক্তির এজেন্সি কখনোই তাদের হাতে থাকছে না। এই বিষয়কে ফিলিস্তিনি-মার্কিন দার্শনিক অ্যাডওয়ার্ড সাইদ ব্যাখ্যা করেছেন ‘বর্ণনার অনুমোদন’-এর সমস্যা হিসেবে। যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনা পরিক্রমায় ‘বর্ণনার অনুমোদন’ থাকবে কার হাতে? নিম্নবর্গের ইতিহাসবেত্তা রণজিৎ গুহ বলেন, ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাস রচনার কাজটি দীর্ঘদিন ধরেই অভিজাত শ্রেণির কর্র্তৃত্বাধীন। উপনিবেশবাদী অভিজাত শ্রেণি এবং বুর্জোয়া-জাতীয়তাবাদী অভিজাত শ্রেণি... এই পক্ষপাতকে লালন করেছে যে ভারতীয় জাতির গঠন এবং যে চেতনা-জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে একচেটিয়াভাবে কিংবা প্রধানত অভিজাত অর্জন বলে নিশ্চিত করেছে। উপনিবেশবাদী এবং নব্য উপনিবেশবাদী ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই অর্জনগুলোর সাফল্য অর্পিত হয় ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসক, প্রশাসক, নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং সংস্কৃতির ওপর; জাতীয়তাবাদী এবং নব্য জাতীয়তাবাদী লেখায় ভারতীয় অভিজাত ব্যক্তিত্ব, প্রতিষ্ঠান, কার্যক্রম এবং চিন্তার ওপর।’

আর এই এজেন্সি হরনের ঘটনা ঘটে জনতার ‘আদারিং’ বা ভিন্নকরণের মাধ্যমে। অভিজাত শ্রেণি ‘সেল্ফ’ বা স্ব-এর ‘আদার’ বা অপর হিসেবে জনতাকে প্রতিষ্ঠা করে। জনতার পরিচয় সবসময় পার্থক্যমূলক। কর্র্তৃত্বশীল কিংবা কর্র্তৃত্বপ্রবণ বিভিন্ন শ্রেণির মাঝে তাদের বিচরণ। তার আকাক্সক্ষার পরিসীমা সে নিজে নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে না। চাহিদা অনুযায়ী পূর্বনির্ধারিত মাত্রার মধ্যে প্রতিস্থাপিত হয়। রণজিৎ গুহের মতে তাই জনতা মানেই নিম্নবর্গ। আর নিম্নবর্গ কি কথা বলতে পারে?

এবার প্রান্তিক মানুষের দিকে যাওয়া যাক অশিক্ষিত চাষা, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, পাগল, দেহপসারিণী, শহরতলির সমাজবিন্যাসের সবচেয়ে নিচু শ্রেণির মানুষগুলো যাদের কোনো আর্থ-সামাজিক পুঁজি নেই, যাদের সামাজিক মাধ্যম বা কোনো প্ল্যাটফর্মে বুলি দেওয়ার ক্ষমতা নেই তারা কি তবে ‘জনতা’র অংশ নন? দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে গণপিটুনিতে নিহত মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল, চট্টগ্রামে গান গাইতে গাইতে পিটিয়ে মারা হলো যে ছিনতাইকারীকে কিংবা যে ভাসমান দেহজীবী নারীরা মার খেয়ে আর পথে নামতে পারছেন না তারা তবে জনতার সম্মান পাবেন কীভাবে?

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক জবাব দেন, নিম্নবর্গের চেতনার প্রশ্ন যখন ওঠে তখন বয়ানে যা উঠে আসে না তাই-ই জরুরি হয়ে ওঠে। সামাজিক বয়ানের অর্থবোধক চিহ্নগুলোর মধ্যে অভ্যুত্থান দাঁড়িয়ে থাকে ‘উচ্চারণ’-এর জায়গায়। প্রেরক-প্রান্তিক মানুষ চিহ্নিত হয় পুনরুদ্ধারের অযোগ্য চেতনা দ্বারা। আর প্রাপকের বেলায় আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, অভ্যুত্থানের প্রকৃত প্রাপক কে? যে ইতিহাসবিদ ‘অভ্যুত্থান’কে ‘জ্ঞানের জন্য বয়ান’-এ রূপ দিচ্ছে, সে একটি সামষ্টিক অভীষ্টে অনুষ্ঠিত সামাজিক কর্মকাণ্ডের একজন প্রাপক মাত্র। হারানো উৎসের জন্য স্মৃতিকাতরতার কোনো সম্ভাবনা না রেখে ইতিহাসবিদকে নিজের চেতনার কোলাহলকে নীরব রাখতে হবে, যাতে অভ্যুত্থানের বিবরণের নিজস্ব বিদ্রোহী-চেতনায় পরিপূর্ণ হয়, ‘তদন্তের বস্তুতে পরিণত না হয়, কিংবা অনুকরণের কাঠামোতে। অভ্যুত্থানের বয়ানে যে সাবজেক্টের কথা উঠে আসে তা কেবল আধিপত্যশীল গোষ্ঠীগুলো আখ্যানের ভেতর অধীনস্থকে যে বৈধতা দেয় তার পাল্টা সম্ভাবনা হিসেবেই কাজ করতে পারে। কাজেই বুদ্ধিজীবীদের মনে রাখতে হবে তাদের সুবিধাই হতে পারে তাদের ব্যর্থতা। কাজেই এক্ষেত্রে তারা বুদ্ধিজীবীদের নতুন প্যারাডাইম বা ধারণাগত নিদর্শন। যে প্যারাডাইম শিফট তারা আনতে চলেছেন (যার প্রক্রিয়া ‘সর্বদা ইতিমধ্যে {অলওয়েজ অলরেডি}’ চলমান) সেখানে কার হেজিমনি বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে সে বিষয়ে সতত সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, ফরাসি তাত্ত্বিক লুই আলথুজের যেমনটা বলে গেছেন, একটি সামাজিক শ্রেণি কখনোই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস বা আদর্শিক রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের মাধ্যমে হেজিমনি কায়েমে ব্যক্তিকে সাবজেক্ট বানানোর চেষ্টা জারি রাখে। এই আদর্শিক রাষ্ট্রীয় যন্ত্র হতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া চক্র, সংস্কৃতি সংঘ, এমনকি পরিবারও। কাজেই নতুন প্যারাডাইমে এই হেজিমনির চাবুক থাকবে কার হাতে? সেটাই নির্ধারণ করবে জনতার বয়ানে ‘বৈধতা’র মোহর পরাবে নাকি হাঁটবে স্বতন্ত্র পথে। 

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

naziabdafrin@gmail.com