হারানো ধানের জাত ফেরানোর লড়াই

রঘুশাইল, হরিরাজ, সাগরফেনা, লক্ষ্মীকাজল, কালিটেপি, রতœা, স্বর্ণামাসুরী, নারকেল মুচি, রান্ধুনীপাগল, পাঙ্গাস, ঝিঙ্গাশাইল, কালিজিরা, সুবাস, বাসমতী, চিনিশঙ্কর, বাদশাভোগ, এক ধানে দুই চাল, জটাবাঁশ ফুল ও বিন্নি বাংলাদেশের একসময়কার পরিচিত ধান। কিন্তু কালের আবর্তে এসব ধানের জাতের বেশিরভাগই বিলুপ্ত। মানুষও ভুলতে বসেছে নামগুলো। তবে বিলুপ্তির পথে যাওয়া পুরনো দিনের এসব ধান বেশ যত্ন করে আগলে রেখেছেন কৃষক জাইদুর রহমান।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের বাসিন্দা কৃষক জাইদুর রহমান বলেন, এমন উদ্যোগী হওয়া বড় কৃতিত্ব তার বড় ভাই ইউসুফ মোল্লার। ২০২২ সালে বড় ভাই ইউসুফ মোল্লা মারা যাওয়ার পর তার বীজ ভান্ডারের দায়িত্ব নেন। আদর্শ কৃষক হিসেবে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ইউসুফ মোল্লা। তার প্রচেষ্টায় বিলুপ্তপ্রায় ২৫০-এর বেশি ধানের বীজ তার বীজ ভান্ডারে সংরক্ষণে আছে।

এত রকম জাতের ধান একসঙ্গে চাষাবাদ ও সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কৃষকপর্যায়ে ইউসুফ মোল্লার বীজ ভান্ডারই প্রথম স্থানে আছে বলে দাবি করেছেন কৃষক জাইদুর রহমান ও কৃষি কর্মকর্তারা।

২০১২ সাল থেকে রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুরসহ সারা দেশে প্রায় ৩০০ কৃষককে ইউসুফ মোল্লা এসব বীজ শর্তসাপেক্ষে সরবরাহ করেছেন। এ ছাড়া ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ঢাকায় ১০০-এর বেশি ও রাজশাহী গবেষণাগারে প্রায় ৬৫ জাতের ধান বীজ সরবরাহ করেছেন। সরবরাহ করা বীজের মধ্যে চলতি আমন মৌসুমে ১৫০ জাতের ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে নিজের জমিতে এবার ১১৫ জাত, একই উপজেলায় ১০, বগুড়ায় ১৫, নীলফামারীতে ১০, ঝিনাইদহে চাষ করেছেন ১২ জাতের ধান। তানোরের দুবইল গ্রামে কৃষক জাইদুর রহমানের জমিতে গেলে দেখা মিলবে প্রায় এক একর জমিতে ১১৫ জাতের ধান চাষাবাদ করেছেন। প্রতি জমিতে আলাদা আলাদা করে ধানের নাম দিয়ে সাইনবোর্ড দেওয়া আছে।

জাইদুর রহমান জানান, পরিবেশবান্ধব সুগন্ধী এসব ধান অল্পদিনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরেই প্রায় ২৫ বছর আগে থেকে বীজ সংগ্রহের কাজ করছিলেন বড় ভাই ইউসুফ মোল্লা। ২০১২ সাল থেকে ৫০টি করে জাতের ধান তিনি অল্প করে আবাদ করেন। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগ্রহী কৃষকদের মধ্যে শর্তসাপেক্ষে বিতরণও করেছেন। একজন কৃষক তার কাছে পাঁচ কেজি বীজ নিলে ধান উৎপাদনের পর তিনি আবার পাঁচ কেজি বীজ ফেরত দেবেন।

এ ছাড়া সংগ্রহে থাকা ১০০ প্রজাতির বেশি বীজ গাজীপুর ও রাজশাহী ধান গবেষণা কেন্দ্রে ৬৫ জাতের বীজ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে ৭২ ও ঝিনাইদহে ১২ প্রকারসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব জাতের ধান সরবরাহ করেছেন। তারা সেগুলোর বিস্তার করা নিয়ে গবেষণা করছে।

বারসিকের কর্মসূচি কর্মকর্তা অমৃত সরকার বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে যেসব বস্তু দ্রুত বিলুপ্তি/হারিয়ে যাচ্ছে, সেসব নিয়ে গবেষণা ও কীভাবে ধরে রাখা যায় সে বিষয়ে কাজ করে থাকেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় ইউসুফ মোল্লার বিলুপ্ত বীজ সংগ্রহের বিষয়ে আর্থিকসহ নানাভাবে ২০১০ সাল থেকে সহযোগিতা করছে বারসিক।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ বলেন, কৃষক ইউসুফ মোল্লার ২৫ বছরের প্রচেষ্টায় বরেন্দ্র থেকে অনেক নামিদামি বিলুপ্ত হওয়া ধানগুলো নতুন করে জীবন পেয়েছে। এখন ইউসুফ মোল্লার মৃত্যুর পর তার ভাই কৃষক জাইদুর রহমান বীজ সংগ্রহ এগিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছেন। তাতে বিলুপ্ত হওয়া ধান সম্পর্কে নতুন প্রজন্মরা আরও জানতে পারবেন।