পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) ভূমিকা এবং কাঠামো পুনর্মূল্যায়নে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আরইবি ও সমিতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা প্রকট আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে ওই কমিটি গঠিত হলো, যার মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধান আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে দুই দফা দাবিতে আন্দোলনের কারণে আরইবির বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তুলে তা বন্ধে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পাশাপাশি আন্দোলন স্থগিত করার পরও কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নানারকম হয়রানি করে আরইবি পরিকল্পিতভাবে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে উসকে দিয়ে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামাঞ্চলসহ সারা দেশে প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে
আরইবি ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ভূমিকা এবং কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ ফারহাত আনোয়ারকে সভাপতি করে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যরা হলেন এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব রহমান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র অধ্যাপক খালেদ মাহমুদ।
কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে আরইবি ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ভিত্তি দলিলসমূহ পর্যালোচনা; তাদের সাংগঠনিক কাঠামো পর্যালোচনা; দুপক্ষের সব স্তরের কর্মীদের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সমিতির প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ; আরইবি ও সমিতির প্রাসঙ্গিক নথি পর্যালোচনা করা।
বিদ্যুৎ বিভাগের এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশে বলা হয়, কমিটির অনুরোধে আরইবি ও সমিতি পিবিএস তাদের সব নথি সরবরাহ করবে। পর্যালোচনা ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে কমিটি একটি প্রতিযোগিতামূলক, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, আর্থিকভাবে টেকসই এবং দক্ষ পরিষেবা দিতে সক্ষম গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন খাতের জন্য উপযুক্ত কাঠামো সুপারিশ করবে। কমিটি প্রয়োজনে যেকোনো সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
আরইবির বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ : আরইবি ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে দীর্ঘদিনের যে দ্বন্দ্ব সেটি এখন বড় আকার ধারণ করেছে। দুপক্ষই একে অন্যের বিরুদ্ধে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে সমিতির অন্তত ১৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা এবং ২৪ জনকে চাকরিচ্যুতসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে আরইবি। এ ছাড়া সমিতির অন্তত ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এমন পরিস্থিতিতে মামলা-হয়রানির ভয়ে সমিতির প্রায় ১৫৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে দাপ্তরিক কাজ বিঘœ হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের গ্রিড বিপর্যয় এবং গ্রাহক ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে আরইবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ বন্ধ ও এই খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি, রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ দেশবিরোধী নানারকম ষড়যন্ত্রের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কাউকে বিনা কারণে হয়রানি করা হচ্ছে না।
গতকাল বৈষম্যহীন পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারের অনুরোধে আন্দোলন প্রত্যাহার করলেও সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একের পর এক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে হয়রানি করছে আরইবি। কোনো কারণ ছাড়াই বিভিন্ন সমিতিতে গণহারে বদলি স্ট্যান্ড রিলিজ করে যাচ্ছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, যা সমিতিগুলোতে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি করছে। বিষয়টি আরইবির উসকানিমূলক চেষ্টা বলে মনে করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নানা হয়রানি আর আতঙ্ক নিয়ে বৈদ্যুতিক লাইনে কাজ করার সময় মানসিক অশান্তির কারণে যেকোনো সময় সময় কর্মীদের প্রাণহানি বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, উন্নত গ্রাহকসেবা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরইবি ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি সংস্কার সময়ের দাবি। ইতিপূর্বে সরকারের পক্ষ থেকে দাবির যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে কমিটি গঠন ও একাধিক মিটিংও হয়েছে। বর্তমানেও সেসব কমিটি দাবির বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করছে। এমনকি বুধবার আরেকটি কমিটি গঠন করেছে সরকার।
তাদের অভিযোগ, স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার আগে নিয়ম অনুযায়ী নোটিস দেওয়া এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া মানার কথা থাকলেও আরইবি তা মানেনি।
আরইবির অধীনে ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। আরইবি ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি একীভূতকরণ এবং অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নসহ চুক্তিভিত্তিক ও অনিয়মিত কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে প্রায় ১০ মাস ধরে আন্দোলন করে আসছেন পল্লীবিদ্যুতের কর্মীরা।