পারসোনাল স্পেস সম্পর্কে অনেকেই আমরা সচেতন না। এর ফলে অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। পারসোনাল স্পেস কেন মেনে চলা উচিত বিস্তারিত জানালেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তানজীর আহম্মেদ তুষার
‘ভাইয়াটা না কেমন!’ জিজ্ঞাসা করা হলো ‘কেমন? কী সমস্যা?’ ‘না কি সমস্যা জানি না তবে কেমন জানি, ভালো লাগে না।’ আরেকটি ঘটনায়, একটি ছেলে ও একটি মেয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। মেয়েটি বলছে তাদের দুজনের মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই, কারণ মেয়েটি তাকে কোনো দিনই ভালোবাসার কথা বলেনি। অন্যদিকে ছেলেটি বলছে, ‘সবসময় প্রেমের কথা মুখে বলা লাগে না, আকার ইঙ্গিতেই বোঝা যায়। আমরা একসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে অনেক জায়গাতে বেড়িয়েছি।’
বিষয় দুটি খতিয়ে দেখে বোঝা গেল সমস্যাটা পারসোনাল স্পেস সম্পর্কে সচেতন না থাকার ফল। পারসোনাল স্পেস হলো প্রতিটি মানুষের চার দিকের একটি অদৃশ্য সীমানা। যে সীমানার মধ্যে অযাচিত কারও অনুপ্রবেশ হলে ব্যক্তি অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এই সীমানাটি মানুষ নিজের নিরাপত্তা ও নিজেদের মধ্যে ভালো যোগাযোগ তৈরির জন্য মনের অজান্তের তৈরি করে থাকে। দুজন ব্যক্তি যখন কথা বলে তারা একে অপরের মধ্যে সম্পর্ক অনুযায়ী দূরত্ব বজায় রাখে। পারসোনাল স্পেসের মাধ্যমে দুজন ব্যক্তির মধ্যে একে অপরের প্রতি পছন্দের ও ঘনিষ্ঠতার মাত্রা, সম্পর্কের ধরন ও মর্যাদার পার্থক্য বোঝা যায়। কারও কারও মধ্যে এই অদৃশ্য সীমানা সম্পর্কে সচেতনা কম থাকে। তখন তাদের মানুষ কম পছন্দ করে বা ভুল বোঝে। অনেক সময় একটি ভালো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় বা বিপদে পড়তে হয়। অন্যদিকে দূরত্ব কম বা বেশি হলে উভয় ক্ষেত্রেই ভাবের আদান-প্রদান সঠিকভাবে হয় না। এসব কারণেই আমাদের নিজেদের এবং পরিবারের টিনএজ সন্তানদের পারসোনাল স্পেস সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।
পারসোনাল স্পেসের ধরন
স্থান কাল পাত্র পরিস্থিতি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন পারসোনাল স্পেস থাকে। তবে সাধারণভাবে সম্পর্কের ভিত্তিতে পারসোনাল স্পেসকে চারটি দূরত্বে ভাগ করা যায়।
ঘনিষ্ঠ দূরত্ব
সাধারণত ০-১৮ ইঞ্চি পর্যন্তকে ঘনিষ্ঠ দূরত্ব বলা হয়। এই দূরত্বে সাধারণত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ আসতে পারে। যাদের আমরা অনেক বেশি বিশ্বাস করি ও ভালোবাসি। যেমন : স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ভাই, বোন ইত্যাদি। এই দূরত্বে অপ্রত্যাশিত কেউ আসলে আমরা খুবই অস্বস্তি অনুভব করি। এটা যেন আমাদের শরীরেরই একটি বর্ধিত অংশ। তবে ঘনিষ্ঠজনরা ছাড়াও বিশেষ ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের জন্য অন্য ব্যক্তি এই দূরত্ব আসতে পারে। যেমন : হ্যান্ডশেক বা ঈদে কোলাকুলি করার সময়ে অনেক কাছে আসলেও আমরা অস্বস্তি অনুভব করি না।
ব্যক্তিগত দূরত্ব
যাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে তাদের সঙ্গে মানুষ এই দূরত্বে কথা বলে। এই মানুষরা আমাদের কাছে চেনা ও বিশ্বস্ত হয়। যেমন : বন্ধুবন্ধব, আত্মীয়স্বজন কলিগ ইত্যাদি। ১৮ ইঞ্চি থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত দূরত্বকে ব্যক্তিগত দূরত্ব বলা হয়। এই দূরত্ব কথা বলার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।
সামাজিক দূরত্ব
অপরিচিত, পাড়া প্রতিবেশী, অল্প পরিচিত, যাওয়া আসার পথে দেখা হওয়া ব্যক্তি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অফিসের বস ইত্যাদি সামাজিক দূরত্বের উদাহরণ। সম্পর্ক ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ৪-১২ ফুট পর্যন্ত দূরত্ব রেখে মানুষ সামাজিক পরিস্থিতিতে কথা বলে।
পাবলিক দূরত্ব
১২ ফুটের ওপরের দূরত্বকে পাবলিক দূরত্ব বলে। পাবলিক দূরত্ব একমুখী যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন মঞ্চে কেউ বক্তৃতা দিচ্ছে শ্রোতা শুনছে। এখানে বক্তা ও শ্রোতার মধ্যের দূরত্বটিই পাবলিক দূরত্ব।
কীভাবে বুঝবেন অন্যের পারসোনাল স্পেসে ঢুকে পড়েছেন?
কারও সঙ্গে কথা বলার সময়ে যদি দেখেন যে আপনার এগিয়ে আসার কারণে ব্যক্তি ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে বা পেছনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে আপনি তার পারসোনাল স্পেসের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। আর না এগিয়ে একটু পিছিয়ে আসুন।
সবসময় এক থাকে না
পারসোনাল স্পেস পাশাপাশি দাঁড়ানো বা বসার ক্ষেত্রে কম থাকে কিন্তু সামনা সামনি বেশি থাকে। পারসোনাল স্পেস ব্যক্তিত্ব, পরিস্থিতি, সামাজিক কারণ, সংস্কৃতি, উচ্চতা ও সম্পর্কের কারণে পরিবর্তন হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে পারসোনাল স্পেস খুবই কমে যায়। যেমন : বাসে, লঞ্চে বা কনসার্টের মতো ভিড়যুক্ত স্থানে পারসোনাল স্পেস কমে যায়। এসব স্থানে নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য ছাদের দিকে বা দূরে কোথাও দৃষ্টি দিতে হয়, অপেক্ষাকৃত কম নড়াচড়া করতে হয় এবং আবেগশূন্য মুখভঙ্গি রাখতে হয়। দুজনের মাঝে কোন টেবিল বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পারসোনাল স্পেস কমে যায়।