ঢামেক হাসপাতাল

কর্মচারীদের ওয়ার্ড মাস্টার পদে যেতে এত লোভ কেন?

সরকারি হাসপাতালে ওয়ার্ড মাস্টার পদটি খুবই লোভনীয়। তৃতীয় শ্রেণির পদ হলেও এ পদে আসতে চান চতুর্থ শ্রেণির অষ্টম শ্রেণি পাস কর্মচারীরাও। এজন্য তারা অবৈধ আর্থিক সুবিধা প্রদানে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের আশ্রয় নিতেও পিছপা হন না। কারণ এ পদটি হচ্ছে অবৈধ আয়ের খনি। হাসপাতালের প্রশাসনের সিন্ডিকেটও ওত পেতে থাকে। তারা অর্থপ্রাপ্তির বিনিময়ে বিধি ভেঙে ওয়ার্ড মাস্টার পদে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরও অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে থাকে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বিধিবহির্ভূতভাবে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ওয়ার্ড মাস্টার পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে অনেক দিন ধরে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গত দুই মাসে চারজন কর্মচারীকে এ দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন বিএনপি ও তিনজন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। এ পদে বসানোর জন্য ৫-৭ লাখ টাকা নেওয়ার কথা শোনা গেছে হাসপাতাল প্রশাসনের তিন সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এ পদে অবৈধ পদায়ন দিতে গিয়ে ঢামেক হাসপাতালে এখন ওয়ার্ড মাস্টার পদে দ্বিগুণ কর্মচারীকে নিযুক্ত করা হয়েছে।

হাসপাতালের স্বার্থে এসব অতিরিক্ত কর্মচারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘বড় হাসপাতাল, রোগী অনেক। কাজেই ওয়ার্ড মাস্টার দরকার। আমাদের ১০০’র ওপরে ওয়ার্ড। কাজে গতি আনার জন্য ভাবলাম, আরও কয়েকজন ওয়ার্ড মাস্টার বাড়ালে কাজ ঠিকমতো হবে।’

অবৈধ আয়ের সুযোগের কারণে সবার চোখ ওয়ার্ড মাস্টারের দিকে এ কথায় একমত প্রকাশ করেন পরিচালক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঠিক, সবাই এ পদে আসতে চায়। ওয়ার্ড মাস্টার, সর্দার এদের কিছু অবৈধ কর্মকান্ডের কথা আমি শুনেছি। এদের কিছু আয়ের সিস্টেম আছে। কিন্তু কেউ তো আমাকে সরাসরি বলে না। সুনির্দিষ্টভাবে কেউ আমাকে বলছে না যে, তারা টাকা নিচ্ছে। তাহলে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নিতে পারি!’

পদ ৬, কর্মরত ১২ জন : জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ার্ড মাস্টারের পদ ছয়টি। হাসপাতালের পুরনো ভবনে চারটি এবং হাসপাতাল-২ ও বার্ন প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে একটি করে মোট দুটি পদ। সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ওয়ার্ড মাস্টার আছেন দুজন। কিন্তু হাসপাতাল প্রশাসন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আরও ১০ জন কর্মচারীকে ওয়ার্ড মাস্টার পদে নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। ফলে ১২ জন ওয়ার্ড মাস্টার এ হাসপাতালে।

মানা হয়নি বিধি : অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত পরিপত্রের (খ)-তে বলা আছে ‘সংশ্লিষ্ট পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো কর্মচারীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব/চলতি দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।’ বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, মার্চ ২৪, ২০১৮-তে সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা উল্লেখ করা আছে ‘(ক) কোনো স্বীকৃত বোর্ড থেকে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ; (খ) কম্পিউটার চালনায় দক্ষতা থাকতে হবে।’

এখন পর্যন্ত যে ১০ জনকে ওয়ার্ড মাস্টারের পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের দুজনের ক্ষেত্রে বিধি মানা হয়েছে। তারা হলেন জিল্লুর রহমান ও আবুল হোসেন। বাকি আটজনের ক্ষেত্রে বিধি মানা হয়নি।

হাসপাতালের জারি করা চিঠি থেকে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মাথায় ১৭ আগস্ট এক অফিস আদেশে সর্দার পদে কর্মরত মো. আইয়ুব আলীকে জরুরি বিভাগে এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে সর্দার মো. আ. আজিজকে ওয়ার্ড মাস্টারের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপর ১ অক্টোবর হাসপাতাল প্রশাসনের অফিস সহায়ক মো. আজিমকে ডিএমসিএইচ-২ ও একই পদের মো. আবদুল আওয়াল লিটনকে নিউরোসার্জারি বিভাগের ওয়ার্ড মাস্টার করা হয়েছে।

এর আগে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. নাজমুল হকের সময় অফিস সহায়ক মো. আরিফ হোসেনকে এবং পাঁচ বছর আগে আবুল বাসার শিকদার, শরিফুল ইসলাম ও কাজী আবু সাঈদকে ওয়ার্ড মাস্টার করা হয়।

হাসপাতালের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ওয়ার্ড মাস্টারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া এ আটজন অফিস সহায়ক বা সর্দার, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও অষ্টম শ্রেণি পাস; গ্রেড ২৩। অথচ ওয়ার্ড মাস্টার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক পাস; গ্রেড ১৬। এ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিতে হলেও সমপদ, সমস্কেল ও সম শিক্ষাগত যোগ্যতা দরকার। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ সেটি মানেনি। অথচ এ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্য অন্তত ৮০ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন।

বিধি লঙ্ঘনের ব্যাপারে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধি লঙ্ঘনের কথা ফালতু। ছোট একটা জিনিসকে অনেক ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলা হচ্ছে। ওয়ার্ড মাস্টার হওয়ার মতো আর কর্মচারী নেই। এভাবেই চলে আসছে। এটা নতুন না। নিযুক্তরা স্থায়ী নয়।’

অর্থ গ্রহণের অভিযোগ : হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তিনজনকে ওয়ার্ড মাস্টার পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার সময় গড়ে ৭ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছায় ও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে ক্ষুব্ধ হয়ে হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক সে আদেশ ছিঁড়ে ফেলেন। পরে অবশ্য ঢামেক ইউনিট আওয়ামী লীগের একটি বড় পদে থাকা একজনের আদেশ বহাল রাখা হয়।

কর্মচারীরা বলছেন, বিধিবহির্ভূতভাবে ওয়ার্ড মাস্টারের দায়িত্ব পাওয়া কর্মচারীরা তাদের মূল দায়িত্ব পালন করছেন না। অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণের বিষয়ে পরিচালক বলেন, ‘যদি কেউ আমার কাছে এ আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ দেয় তাহলে আমি তাদের বরখাস্ত করব, জেলে পাঠাব। কিন্তু যে দুই-তিনজনের কথা বলা হচ্ছে, তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের কোনো ভূমিকা নেই। অভিযোগ রঙচং লাগিয়ে বলা হচ্ছে।’

সবাই আওয়ামী লীগের লোক : জানা গেছে, বর্তমান সরকারের সময় দুই দফায় ওয়ার্ড মাস্টারের পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনই আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা ও একজন বিএনপি নেতা। বাকি ছয়জনও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এসব কর্মচারীর অধিকাংশের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর রিয়াজ উদ্দিন ও জিল্লুর রহমানের কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে নানা অনিয়মের সত্যতা পেয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। তাদের কিছুদিন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়।

এ পদে লোভ কেন : হাসপাতালের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য কর্মচারীরা এ পদে আসতে চান। তারা এখানে এসে ওয়ার্ড বয় ও সুইপারদের মাধ্যমে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে পাঠানোর জন্য তাদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করেন। ওয়ার্ড মাস্টাররা টাকা নিয়ে বাইরের লোকজনকে নানা কাজ দেন। সুইপার, জমাদার বা সর্দার পদে নিয়োগবাণিজ্য করেন। তাদের বিরুদ্ধে হাসপাতালের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বাইরে বিক্রি করে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে পাঠিয়ে, বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন পান। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের ছুটি ও বদলির বাণিজ্যও করেন তারা। আইসিইউতে রোগী পাঠাতে তারা রোগীপ্রতি ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। স্পেশাল আয়া ও ওয়ার্ডবয়সহ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে জনপ্রতি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা নেন।

এ অবৈধ সুবিধাপ্রাপ্তির প্রমাণও মিলেছে। গত ১৫ আগস্ট ঢামেকের জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড মাস্টার রিয়াজ উদ্দিন ও নতুন ভবনের ওয়ার্ড মাস্টার জিল্লুর রহমানের কক্ষে অভিযান চালান বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা। তারা রিয়াজ উদ্দিনের কক্ষ থেকে মদের বোতল, পুলিশ কেসের সিল, ধারালো অস্ত্র, বেসরকারি হাসপাতালের ভিজিটিং কার্ড, আবাসিক হোটেলের ভিজিটিং কার্ড ও ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের তালিকা পান। জিল্লুর রহমান জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা নিয়ে তাদের হাসপাতালে নিয়োগ দেওয়ার কথা স্বীকারও করেন। আর রিয়াজ উদ্দিন স্বীকার করেন, বিভিন্ন আইসিইউতে রোগী পাঠিয়ে রোগীপ্রতি ১ হাজার টাকা করে নেন তিনি। রিয়াজ উদ্দিন আওয়ামী লীগ ঢামেক ইউনিটের সদস্য ও জিল্লুর রহমানকেও তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের মিছিল-সমাবেশে দেখা গেছে। তাদের মূল পদ অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর। এতদিনে তাদের পদোন্নতি পেয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার কথা। কিন্তু তারা পদোন্নতি নেননি ও হাসপাতাল প্রশাসনও দেয়নি। এ পদ এতটাই লোভনীয় যে, তারা এ পদেই থেকে গেছেন।

খুব শিগগির নিয়োগ : ওয়ার্ড মাস্টারসহ শূন্যপদগুলোয় নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান পরিচালক। তিনি বলেন, ‘গত ১৩-১৪ বছর ওয়ার্ড মাস্টারসহ শূন্যপদগুলোয় নিয়োগ হয়নি। আমি উদ্যোগ নিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্সও পেয়েছি। ডিপিসি হয়ে গেলেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করব।’