গুলিবিদ্ধ মাহবুব

থাইল্যান্ড-ভারতে চিকিৎসার পরেও চোখের আলো ফেরেনি

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৪৯ এএম

পুলিশের গুলি থেকে আন্দোলনরত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রক্ষা করে নিরাপদ স্থানে পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন মাহবুব। কিন্তু মুহূর্তেই মাথায় ও মুখে পুলিশের ছররা গুলি লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। গুলির আঘাতে তার চোখের নার্ভ এবং বাম চোখের পর্দা ফেটে গেছে। এখনো ভেতরে রয়ে গেছে ছররা গুলি। পরিবারের সঞ্চিত অর্থ ও স্বজনদের সহযোগিতায় মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে উন্নত চিকিৎসার আশায় প্রথমে বাংলাদেশ এরপর ভারত ও থাইল্যান্ডের ১৮টি হাসপাতালের চিকিৎসককে দেখানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। চিকিৎসক জানিয়েছেন আমেরিকা কিংবা বৃটেনে নেওয়া হলে মাহবুব অন্তত একটি চোখে দেখতে পারবেন। তবে আর্থিক সংগতি না থাকায় সেদিকে আর পা বাড়াতে পারছে না পরিবার।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়া এলাকার ভাড়া বাড়িতে থাকেন মাহবুব ও তার পরিবার। তার বাবা মশিউর রহমান শহরের টানবাজারে সুতার ব্যবসা করেন আর মা হালিমা বেগম গৃহিণী। তাদের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। মশিউর ও হালিমা দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে মাহবুব একমাত্র ছেলে। নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে চলতি বছর স্নাতকোত্তীর্ণ মাহবুব আট মাস আগে বিয়ে করেন ।


সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় মাহবুব বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন চলাকালে গত ১৮ জুলাই শহরের চাষাঢ়া এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী বেশি ছিল। পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে নিরাপদ জায়গায় নিতে মাধবী প্লাজার গলিতে ঢুকে পড়ি। কিছুক্ষণ পর পুলিশ আছে কি না, দেখতে উঁকি দিলে পুলিশের ছররা গুলি এসে বাম চোখ ও মাথায় লাগে। এরপর থেকে আমি আর চোখে দেখছি না।’ মাহবুব বলেন, ‘আমার ফটোগ্রাফির শখ ছিল। এখন আমার নিজের কাছে মনে হচ্ছে আমি যেন এক ডানাকাটা পাখি।’


মাহবুবের বাবা মশিউর রহমান বলেন, মাহবুবের মুখম-লে ৩৪টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়েছিল। বাম চোখে গুলি লেগে নার্ভ ছিঁড়ে গেছে এবং চোখের পর্দা ফেটে গেছে। গুলি হাড় ভেদ করে মস্তিষ্কের ভেতরে চলে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রথমে ভারত ও পরে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও কোনো কাজ হয়নি। ইতিমধ্যে মাহবুবের চিকিৎসায় তাদের জমানো টাকাসহ স্বজনদের সহযোগিতায় মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করলেও চোখের আলো ফেরেনি। বাংলাদেশের রেটিনা গ্লুকোমা সেন্টারের চিকিৎসক প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আরিফ হায়াৎ পাঠান জানিয়েছেন বৃটেন কিংবা আমেরিকায় নিতে পারলে মাহবুবের চোখের আলো ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আমাদের সেই সামর্থ্য নেই। সরকার সহযোগিতা করলে বিদেশে উন্নত চিকিৎসায় আমার ছেলে চোখের আলো ফিরে পেতে পারে। না হলে াকি জীবন অন্ধত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হবে।

মা হালিমা বেগম বলেন, সন্তান ভবিষ্যতে মা-বাবাকে পথ দেখিয়ে চালাবে, কিন্তু সেই সন্তানকেই মা-বাবার হাত ধরে চলতে হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে মাহবুবের বিয়ে হয়েছে। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে প্রায়ই আড্ডায় মশগুল থাকত। কিন্তু এখন সে গৃহবন্দি। আমরা আর কয়দিন বাঁচব। চোখে দেখতে না পেলে ভবিষ্যতে মাহবুব কীভাবে চলবেÑ তা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হালিমা।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত