বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, মানবাধিকার আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশ্লেষক ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক নানা জটিলতা আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার প্রশ্নও নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। সার্বিক বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই আইনজীবী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : আপনি জানেন হাসিনা সরকারের পতন ও রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে সাংবিধানিক সংকটের বিষয়টি নানাভাবে আলোচনায় আছে। এ নিয়ে আপনার সার্বিক পর্যবেক্ষণ কী?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : ধন্যবাদ। এখন সংবিধানের আলোচনা যে কারণে বারবার উঠে আসছে, সেটার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের শুরুর দিন থেকে। সংবিধানকে অনেকে বাইবেল মনে করার চেষ্টা করছেন। আমাদের রাজনীতিবিদরাও সেভাবে প্রচার-প্রচারণাও করেছেন। একটা লিগ্যাল সুপ্রিমেসির প্রশ্ন থাকে, কনস্টিটিউশনাল একটা ব্যাপার। সেই সুপ্রিমেসিটাকে আমরা বলার চেষ্টা করি পার্লামেন্টারি সুপ্রিমেসি। তো পার্লামেন্ট কেন সুপ্রিম? যেহেতু জনগণ আসলে সুপ্রিম। কারণ পার্লামেন্ট তো জনগণের ক্ষমতা চর্চা করছে। তার মানে হচ্ছে জনগণের ইচ্ছের প্রতিফলন থাকে সংবিধানে। এটাকে বলে সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট, সামাজিক চুক্তি। এখন সংবিধানে যতক্ষণ পর্যন্ত এই সামাজিক চুক্তি বা জনগণের যে সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট সেটাকে স্বীকার করে নিচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত সমাধান খুঁজতে হবে ওখানে (সংবিধানে)। কীভাবে অধিকারগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছেন আর কীভাবে আপনি বলেছেন যে এটা এভাবে দেওয়া যাবে বা যাবে না। অর্থাৎ স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির ব্যাপারটা। তো সেখানে দেখবেন যে এই ধরনের উৎখাত করে সরকার গঠন কিংবা সরকারে আসা কিংবা এই সংবিধানের বিধিবিধানকে অবজ্ঞা করে আসতে পারার মতো প্রভিশনটা বন্ধ করা হয়েছে ফিফটিন অ্যামেন্ডমেন্টের মাধ্যমে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৭-এর খ বলে নতুন একটা অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বলা হচ্ছে যে, এই সংবিধানের কোনো কিছুকে যদি কেউ ভায়োলেট করে বা জোরপূর্বক পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসার যে ব্যাপারটা অর্থাৎ ক্যু-টাকে প্রিভেন্ট করা আছে। সোজা কথা কোনো ধরনের বিপ্লব-অভ্যুত্থান যাতে না হতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেটাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে। এটাতে যারা মদদ দেবে, সমর্থন দেবে প্রত্যেকেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অপরাধী হবে এবং রাষ্ট্রের যে সর্বোচ্চ শাস্তি তার বিরুদ্ধে দেওয়া যাবে। সংবিধানের কয়েকটা বেসিক স্ট্রাকচার আছে সেগুলো পরিবর্তন করা যাবে না। তার মধ্যে এই যে দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৭-এর খ ঢুকাল সেটাও পরিবর্তন করা যাবে না। এই বলে তারা এটার প্রটেকশন দিয়ে দিল; মৌলিক অধিকারগুলো পরিবর্তন করা যাবে না যেটা তৃতীয় ভাগে আছে; প্রশাসন-অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কীভাবে চলবে সে সংক্রান্ত বেশ কিছু অনুচ্ছেদ আছে।
দেশ রূপান্তর : তাহলে জুলাই-২৪ এর অভ্যুত্থানকারী এবং সরকার গঠনকারীরা তো বিপদে আছে! অবশ্য অভ্যুত্থানকারীদের সাজা দেওয়া যাবে না বলে একটা প্রজ্ঞাপন এসেছে। সেটা কি এটার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায় না?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : সেখানে আসছি ক্রমে। এই ধরনের বিধান থাকা অবস্থায় আপনি কনস্টিটিউশনের অধীনে শপথ গ্রহণ করলেন। তাহলে আপনি ওই সংবিধানকে মানবেন, কারণ সংবিধানকে মেনেই তো শপথ গ্রহণ করলেন। যখন বিপ্লবের মাধ্যমে বা কোনো গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাত হলো তারপর তো আর এই সংবিধানের অধীনে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে শপথ নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা বা প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কারণ চুক্তিটা ভেঙে গেছে। বিপ্লবী সরকারগুলো নিজেরা পাওয়ার অ্যাজিউম করে বলে যে, আমরা ক্ষমতা নিলাম, আমরাই আইন, আমরাই সব কিছু, আমরা করব, জনগণের ম্যান্ডেট আমাদের সঙ্গে আছে বা জনগণের মতামতকে তারা যাচাই করে নেবে। সেটা গণভোটের মাধ্যমে হতে পারে, অন্য যেকোনো ফর্মে হতে পারে। তো তাদের তো আসলে রাষ্ট্রপতির অধীনে শপথ নেওয়ার দরকার নেই।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু তারা তো শপথ নিয়ে ফেলেছেন, তাহলে...
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : তাহলে রাষ্ট্রপতির অধীনেই যখন সবাই মিলে শপথ নিল তাহলে সংবিধানের মধ্যে থেকেই তো বাকি কাজকর্মগুলো করতে হবে। কিন্তু সংবিধানের মধ্যে থেকে কাজগুলো করার কোনো সুযোগ নেই। যে সমস্ত সংস্কারের কথা আমরা বলছি সেই সমস্তগুলোর মধ্যে তো সংবিধান নিজেও একটা সংস্কারের প্রশ্নের মধ্যে পড়েছে। সংবিধান সংস্কার করার জন্য আলাদা একটা কমিশন হয়েছে। তাহলে কমিশন করে এই যে পার্লামেন্ট ছাড়া সংবিধান সংশোধনের আলাপ তুলছেন সেটাও তো ওই ৭-এর খ অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতার মধ্যে পড়ে।
দেশ রূপান্তর : এটা থেকে তারা বের হবেন কীভাবে?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : সংবিধানের মধ্যে সমাধান খুঁজতে গেলে কানাগলিতে হারাতে হবে। এখন এই যে সংবিধানের মধ্যে আছি-নাই, আছি-নাই একটা সিচুয়েশনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি, এটা কি সংবিধানে আছে? সবাই প্রশ্ন করে এটা কি সংবিধানে আছে? নেই। রাষ্ট্রপতির ইস্যুটাও যদি চিন্তা করেন, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ পান সংসদের মাধ্যমে। পার্লামেন্ট তো নেই। ৫০-এর ৩ উপ-অনুচ্ছেদে আছে রাষ্ট্রপতি লিখিত স্বাক্ষরযুক্ত পত্র স্পিকারের কাছে জমা প্রদানের মাধ্যমে পদত্যাগ করবেন। স্পিকার তো নেই, আর ডেপুটি স্পিকারের অস্তিত্ব নেই যখন সংসদ ভেঙে দিলেন। কেউই নেই। তাহলে এ রকম একটা পরিস্থিতিতে উনি পদত্যাগ করতে চাইলে কার কাছে করবেন এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং কাউকে যদি রিঅ্যাপয়েন্ট করতে হয় তাহলে তিনি কোন আইনের অধীনে কীভাবে রিঅ্যাপয়েন্ট হবেন? প্রশ্নটা উঠছে যেহেতু আপনি শপথটা নিলেন ওই সংবিধানের অধীনে। তাহলে সংবিধানে কি বিধান আছে সেটা খুঁজতে হবে। কিন্তু আমরা যে সিচুয়েশনের মধ্যে আছি, সংবিধানে সেই সিচুয়েশনের কোনো কিছু নেই। কিন্তু সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে, তাই আপনার পথ বার করতে হবে। একটা পার্টিকুলার কনসেপ্ট আছে যেটাকে বলে ডকট্রিন অব নেসেসিটি। সংবিধানে নেই বলে তো জনগণ সাফার করবে না, প্রয়োজনে সংবিধান পাল্টাবে; সংবিধান তো পরিবর্তন হয়ই। ১৭ বার তো আমাদেরটাও হলো। সংবিধানে যে পরিবর্তন আসবে সেখানে এইসব পদ্ধতিকে অ্যাকুমোডেট করবে।
দেশ রূপান্তর : সেটা কি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করতে পারে কি না?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেও তো সংবিধানে কিছু নেই। তাহলে তারা যে কাজগুলো করছেন সেগুলোর ম্যান্ডেটটা কোথায়? ম্যান্ডেট হলো এই জনগণ। জনগণ যদি না চাইত তাহলে রাস্তায় নেমে আবার বলত যে তোমরা নামো, তোমাদের চাই না। ফলে তাদের কাজের এখন সমাধান খুঁজতে হবে রাজনৈতিকভাবে। জনগণের মতামত নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের ভিত্তিতে তারা এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে। পলিটিশিয়ানরা আইন তৈরি করেন জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে। ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট কিছু (সংস্কার) করে গেল বা শুরু করল, এটার লিগ্যালিটি তৈরির দায়িত্ব হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের।
দেশ রূপান্তর : সংস্কারের জন্য কয়েকটি কমিশন হয়েছে। সংবিধান ও বিচার বিভাগ নিয়েও হয়েছে। এদের কাজের পরিধি আসলে কতখানি?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : কমিশন হচ্ছে ১৯৫৬ সালের আইনে। সেখানে কোড অব ইনকুয়েরি অ্যাক্ট বলে একটা অ্যাক্ট আছে। এই অ্যাক্টের মধ্যেই কমিশন-সংক্রান্ত যেসব বিধিবিধান এবং তাদের ক্ষমতা দেওয়া, সেটা তো রাষ্ট্রপতির সিগনেচারেই হয়েছে। এখানে সংবিধান থেকে ভ্যালিডিটি খোঁজার বা বৈধতা খোঁজার দরকার নেই। এই কোড অব ইনকুয়েরি অ্যাক্টের অধীনেই কমিশন গঠন হয়। কমিশন বৈধ-অবৈধের প্রশ্নের চেয়ে চিন্তা করতে হবে কমিশনের আসলে কাজের পরিধি কতটুকু। সংবিধানকে নিয়ে বলি। কনস্টিটিউশনাল রিফর্ম কমিটি শুধু একটা প্রস্তাবনা দিতে পারবে। জাস্ট রেকমেন্ডেশন। সেই রেকমেন্ডেশন নেবে কি নেবে না সবটাই ডিপেন্ড করছে নির্বাচিত সরকারের ওপর। কিংবা নির্বাচিত সরকার আসার আগেই যদি অন্তর্বর্তী সরকার মনে করে তাদের এই রেকমেন্ডেশনের ভিত্তিতে যা যা সংস্কার করার আছে করে ফেলবে এবং করার পর পরবর্তী নির্বাচিত সরকার সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকে ৩০ কার্যদিবসের ভেতরে অর্ডিনেন্সটা অ্যাক্ট হিসেবে পার্লামেন্টে পাস করাতে হবে। এটা অর্ডিনেন্সই হবে, কেননা এটা রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে যাচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : আপনার কথা শুনে যতটুকু মনে হচ্ছে রাষ্ট্রপতির এখন পদত্যাগ করার স্পেস নেই। ব্যাপারটা কি সে রকমই? ডকট্রিন অব নেসেসিটির জায়গা থেকে পদত্যাগ করলেন বা সরিয়ে দেওয়ার কোনো স্পেস আছে?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : স্পেস নেই যদি সংবিধানে খোঁজেন। কিন্তু যদি ডকট্রিন অব নেসেসিটির জায়গায় যান তাহলে স্পেস আছে। আর সরিয়ে দিতে গেলে অনেক ঝামেলা আছে রেফারেন্স লিখতে হবে, টু-থার্ড মেজরিটি লাগবে, অনেক রকমের লম্বা প্রসেস; কিন্তু সেটার তো এই মুহূর্তে সুযোগ নেই। হয় ওনাকে রিজাইন করতে হবে নতুবা এমন সিচুয়েশনের মধ্যে যেতে হবে। আরেকটা বিষয় আছে ধরেন, পুরো বিষয়টাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রপতির কাছে মনে হচ্ছে যে তিনি রিজাইন করবেন। কিন্তু রিজাইন করার মতো ফোরাম নেই। এখন উপায়টা হচ্ছে, উনি যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের সমাধানের জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে রেফারেন্স পাঠান, সেটা তিনি ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পাঠাতে পারেন।
দেশ রূপান্তর : গত ১৫ বছরে মানবাধিকার বড় প্রশ্নের মুখে ছিল। ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : প্রথমত, গত ১৫ বছর গুম-নিপীড়ন থেকে শুরু করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে চেহারাটা ছিল তার গুণগত পরিবর্তন হয়েছে এটা স্বীকার করে নিতেই হবে। গুমের ঘটনা নেই, ক্রসফায়ার নেই, কথায় কথায় জেলে ঢোকানো নেই। সাধারণ নাগরিকরা তাদের মতো করে কথা বলছে, ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের ওপরে বাধা নেই। সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একদম চাপে নেই বলব না, চাপ ভিন্নভাবে আছে কিন্তু আগের চেয়ে বেশি ফ্রিডম ডেফিনেটলি ভোগ করছেন। কিছু কিছু মৌলিক জায়গায় বেশ কিছু ডেভেলপ হয়ছে এবং সেটা সিচুয়েশন চেঞ্জের কারণে।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু আগের মতো শত শত অজ্ঞাতনামা আসামির নামে মামলা হচ্ছে, এসব মামলায় সাধারণ নাগরিক হয়রানির ভেতর পড়ে। তারপর সাংবাদিক আটক হচ্ছেন ফৌজদারি মামলায়..., জেড আই খান পান্নার কথা বলা যেতে পারে। মানে নতুন একটা ভয় কি তৈরি হচ্ছে না?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : আপনি যেটা বলছেন যে নতুন করে আবার ফিয়ার তৈরি হয়েছে, মামলার কথা বলে শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় দুই নম্বরি করে নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মার্ডার কেসের আসামি করা হচ্ছে। সাংবাদিক বা অন্যান্য ব্যক্তিকে আসামি করা হচ্ছে, যেমন পান্না সাহেবের কথা ধরেন এটা প্রতিহিংসা ছাড়া তো আর কিছু না। কথা হচ্ছে, ‘রুল বাই ল’ নট ‘রুল অব ল’; আওয়ামী লীগের পুরো পিরিয়ডটাকে আমি বলি রুল বাই ল’ অর্থাৎ আইনকে ব্যবহার করে আপনাকে কীভাবে সাইজ করা যায়, কীভাবে দমন-পীড়ন করা যায়। একটা টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই একই টেনডেনসি কিন্তু এখনো আছে। এখন ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী স্টিগমা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে, তাদের ব্যবসাপাতি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও তাই, মামলা দেওয়া হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : সংবাদ প্রকাশ নিয়ে তো মামলা হচ্ছে না, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে ফৌজদারি অভিযোগে।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : সাংবাদিক বলে যে আপনি অপরাধ করতে পারবেন না, বিষয়টি কিন্তু সে রকম না। কিন্তু আপনি যখন আইনের প্রয়োগের জায়গায় যাবেন, প্রতিষ্ঠান থেকে যখন যাবেন তখন একটা মামলা দিয়ে ধরব, ধরার শুরু থেকে যেটা আমাকে মাথায় রাখতে হবে সেটা হচ্ছে প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স। আপনার প্রতি আচার-আচরণ হতে হবে একজন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে। আইনি যে সমস্ত সুরক্ষাগুলো আছে তার সবটা দিয়েই, সম্মান দিয়েই আপনাকে ট্রিট করতে হবে, অসম্মান করা যাবে না। হ্যাঁ, আপনি যদি মব জাস্টিস করে মেরে ফেললেন, ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেললেন সেগুলোর তো আর আইনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পুরোটাই বেআইনি প্রক্রিয়ায় একজনকে আপনি মেরে ফেললেন সেটা ইটসেল্ফ একটা ক্রিমিনাল অফেন্স। কিছু কিছু সাংবাদিকদের আমরা জানি যে, কোর্টের মধ্য নিয়ে যাওয়ার পরে শারীরিকভাবে হামলা করার ঘটনা ঘটেছে, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর শারীরিকভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একজন আইনজীবী গ্রেপ্তার হয়েছেন, হয়তো তার বিরুদ্ধে অনেকেরই রাগ আছে। কিন্তু তাকে যেভাবে পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেটাও শোভন মনে হয়নি, তার আইনজীবী সাংবাদিকদের বক্তব্য দিচ্ছেন সেখানে তাকে যেভাবে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে সেগুলো তো শোভন কোনো আচরণ নয়। এগুলো আওয়ামী লীগ আমলে ওরা করেছে।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু মামলা, গ্রেপ্তার ইত্যাদি দিয়ে হয়রানি বা শিক্ষা দেওয়ার বিষয়ে হাসিনা সরকারের একটা গ্রিন সিগন্যাল, অনুমোদন বা সমর্থন টের পাওয়া যেত, এখনকার পরিস্থিতিটা কেমন?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : এখনকার পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দুই রকম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রিন সিগন্যাল আছেও ধরে নিতে পারবেন। আবার বাহিনী হিসেবে পুলিশ মোরালি খুব দুর্বল হয়ে গেছে এখন। এখন যারা এম্পাওয়ারড ফিল করছেন যেমন, জামায়াত-বিএনপির লোকজন যারা মনে করছেন যে তারাই এখন ক্ষমতায়। ফলে তারা নানান রকমের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তাদের অনেক ক্ষেত্রে সে বাধা দিতে পারছে না।
দেশ রূপান্তর : যেসব মামলা দিয়ে আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীদের আটকানো হচ্ছে, সেসব কীভাবে দেখছেন?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : এগুলো তো খুবই অ্যাবসার্ড। যারা ক্ষমতায় তাদের কোনো টিম এফোর্ট ছিল না শুরু থেকেই। এখনো কোনো টিম এফোর্ট দেখতে পাইনি। সাধারণ মানুষকেও বলেননি যে, কোথায় কী মামলা করবে, কোথায় বিচার হবে রীতিমতো ধোঁয়াশা। এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ যে যেভাবে পেরেছে মামলা করেছে।
দেশ রূপান্তর : যদি পরে প্রমাণিত হয় যে হামলার সঙ্গে আসামি জড়িত না। সেক্ষেত্রে কি কোনো আইনি শাস্তির ব্যবস্থা আছে?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : আছে, মিথ্যা মামলা করার জন্য, টোটাল মামলা যদি মিথ্যা প্রমাণ হয় সেক্ষেত্রে। কিন্তু এখানে বিষয়টা আরও কমপ্লেক্স। এখানে মামলার ঘটনা মিথ্যা না, কিন্তু এখন আসামি যেভাবে করা হচ্ছে সেখানে সমস্যা। ধরেন একজন ব্যক্তি রংপুরে থাকেন, তার ছেলে ঢাকাতে পড়াশোনা করে। সে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে বা ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলিতে নিহত হয়েছে। এখন ওই ভদ্রলোকের বাবা এসে ঢাকাতে মামলা করবেন কার বিরুদ্ধে? তাহলে নামগুলো কোথা থেকে আসছে? কিছু নাম আছে যেগুলো কারও জানার দরকার পড়ে না, অটোমেটিক্যালি নাম থাকবে। যেমন ধরেন সুপেরিয়র রেস্পন্সিবিলিটির জায়গা থেকে শেখ হাসিনার নাম আসছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম আসবে, আইজিপির নাম আসবে এগুলো আলাদা করে জানার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এর পরের নামগুলো যখন ৩-৪শ জনের নাম দিচ্ছেন, সেটা কীভাবে? বেসিক্যালি সামওয়ান প্রোভাইডিং ইউ দোস নেইমস এবং সে কিন্তু বাণিজ্য করে টাকার বিনিময়ে নাম দিচ্ছে আর আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে আপনি নাম না দিলে তো মামলা টিকবে না। এখন এই ৩০০-৪০০ মানুষ যাদের ঢুকানো হলো তাদের তো মার্ডার কেসের সঙ্গে দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। তাতে যেটা হবে, তদন্তটা সময়সাপেক্ষে হবে, তদন্তের পর্যায়েই বেরিয়ে আসবে যে এদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু আমার যেখানে এই প্রশ্নের সঙ্গে আরেকটা অ্যাংজাইটি, সেটা হলো, যাদের ধরে হত্যা মামলায় ইমপ্লিকেট করা হচ্ছে তাদের আরও ১০০টা ভিন্ন ভিন্ন রকমের অপরাধ আছে, করাপশনের অপরাধ তো আছেই। বিদ্যমান ফৌজদারি আইনেই অন্তত ডজনখানেক মামলা করা যায় এ রকম বহু অপরাধ তার বা তাদের আছে। কিন্তু আপনি তাকে ধরে রেখেছেন শুধুমাত্র একটা হত্যা মামলায়। তাকে তো আসলে পার পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কারণ পুলিশ তদন্তের পর্যায়ে বলবে যে উনি তো এই মামলায় ছিলেন না। ফলে এখানে দুটো বিষয় আলাদা করে বলব যে ভিকটিম যে শিক্ষার্থী আমার-আপনার জন্য প্রাণ দিল তার পরিবার তো বিচার পাবে না। বিচার পাওয়াটা দীর্ঘায়িত হবে, সত্যিকারের আসামি হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না।
দেশ রূপান্তর : শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে, এটা কি খুব জরুরি কিছু?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : আমার কাছে মনে হয় এই আলাপটা খুবই অপ্রয়োজনীয়। এক ধরনের ক্রাইসিস করার জন্য এটা শুরু থেকেই হচ্ছে। কারণ উনি যখন চলে যান তার চলে যাওয়ার মুহূর্তটা তো আগে আপনাকে চিন্তা করতে হবে যে, উনাকে তো কেউ চলে যেতে বলেনি। কিন্তু রক্তপাত হতো উনি না গেলে। উনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও তো ছিল শূন্য। বড় ধরনের একটা ঘটনা ঘটত। তাহলে সেনাবাহিনী সেই সময়ে চেষ্টা করেছে উনাকে অ্যাটলিস্ট প্রাণে বাঁচিয়ে সেফ এক্সিটের জন্য। কথা হচ্ছে উনি পদত্যাগ না করে যদি চলেও যান তাতেও তো ভ্যাকেন্সি তৈরি হয়ে গেল। তারপরে হচ্ছে তার কন্ডাক্টের মাধ্যমে অর্থাৎ উনি যে চলে গেছেন সেটা উনার আচরণের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে উনি আসলে পদত্যাগ করে চলে গেছেন। একটা কাগজে কী থাকল না থাকল সেটাতে তো কিছু যায় আসে না। পালিয়ে গেছেন, এরপর তো আর পদত্যাগের কিছু থাকে না। ফলে এরপর তো ওই ফরমালিটির ব্যাপার নেই।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : আপনাকেও ধন্যবাদ।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়