ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবি বর্তমানে এক জ্বলন্ত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি কেবল শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো বা প্রশাসনিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত মান, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর সঙ্গে ৭ কলেজের অধিভুক্তি নিয়ে যে ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ বিষয়ে সময়ক্ষেপণ করলে কী ধরনের বহুমাত্রিক সমস্যা হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও বর্তমান অবস্থা : শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মানের দিক দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘকাল ধরে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে, গত কয়েক দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু সমস্যা দৃশ্যমান হয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সেবা ও সুযোগ-সুবিধা সে তুলনায় বাড়েনি। গবেষণার মান, সেশনজট, শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে নানাবিধ সমালোচনা উঠছে। এরই মধ্যে ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন ঢাবির ভাইস চ্যান্সেলর ও সরকারের নেতৃত্বে ঢাবির অধীনে ৭টি সরকারি কলেজকে অধিভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সমস্যাগুলোকে আরও প্রকট করেছে।
অধিভুক্তি : সুবিধা না বোঝা? : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৭ কলেজের অধিভুক্তির পেছনে সরকারের যুক্তি ছিল উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সমন্বয় বৃদ্ধি। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি তিতুমীর কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা কলেজ, সরকারি কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুরের বাঙলা কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ঢাবির অধীনে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য ছিল একটি একক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো প্রমাণ করেছে। অধিভুক্ত ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা কিছুটা পরিচয় সংকটে ভোগে। বিভিন্ন জায়গায় তারা নিজেদের অধিভুক্ত ৭ কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে ইতস্তত বোধ করে। তাছাড়াও, তারা নিজেদের ঢাবি শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়ে টিউশন পড়িয়ে থাকেন। এমনকি নীলক্ষেত থেকে নকল আইডি কার্ড বানিয়েও তারা ব্যবহার করেন। এসব কারণে ঢাবি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। উভয়েরই বর্তমান দাবি অধিভুক্তি বাতিল করা। এ ধরনের অধিভুক্তি প্রথমত প্রশাসনিক স্তরে চাপ সৃষ্টি করেছে। ঢাবির প্রশাসন এরইমধ্যে নিজেদের শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিকভাবে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে ৭টি কলেজের প্রায় আড়াই লক্ষাধিক শিক্ষার্থী ও তাদের অ্যাডেমিক কার্যক্রমের দায়িত্ব নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরীক্ষার রুটিন, ফলাফল প্রকাশ, রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষও বেড়েছে।
শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি : শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে যে অধিভুক্তি করা হয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে বলেই এখন প্রমাণিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন যে, ৭ কলেজের অধিভুক্তির পর শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি হয়েছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অতিরিক্ত চাপের কারণে সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারছে না। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা, সেশনজট, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সেবা সম্পর্কিত সমস্যা নিয়মিত ঘটছে। ঢাবি রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে বিভিন্ন সমস্যার যথাযথ সমাধান পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও আন্দোলন : ৭ কলেজের অধিভুক্তির পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে একাধিকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছেন। এরমধ্যে ২০১৯ সাল এবং ২০২৩ সালের আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সময় আন্দোলনের মূল বিষয় সংস্কার থাকলেও বর্তমানে তা এক দাবিতে পরিণত হয়েছে। তা হচ্ছে ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিল। এই ইস্যুতে ৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একমত ঢাবি শিক্ষার্থীরাও। অধিভুক্তি বাতিলে তারাও ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করছে। গত ২২ তারিখেও ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। তারা এখন বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে নিউ মার্কেট, সায়েন্সল্যাব এলাকা অবরোধ করছে। এর আগেও ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাবির নিজস্ব লোগো ব্যবহারের দাবি তুলেছিল। বিশেষত সেশনজট এবং পরীক্ষার ফলাফলসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা অনেকাংশে অধিভুক্তির কারণে। এই অধিভুক্তির ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের কর্মজীবনে প্রবেশ করতে দেরি হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এমনকি ঢাবির নিজস্ব শিক্ষার্থীরা এ অধিভুক্তির কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধান চেয়েও বারবার কর্র্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।
প্রশাসনিক জটিলতা এবং কাঠামোগত সমস্যা : অধিভুক্তির ফলে প্রশাসনিক কাঠামো অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। ঢাবি একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর অধীনে অনেক বিভাগের সমন্বয় এবং পরিচালনা করতে হয়। এর মধ্যে অতিরিক্ত ৭টি কলেজ যোগ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে গেছে। প্রত্যেক কলেজের আলাদা প্রয়োজন, শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং তাদের ব্যবস্থাপনা এই প্রশাসনকে অনেক বেশি চাপে ফেলেছে। এর ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ঢাবির প্রশাসন তাদের পূর্ববর্তী শিক্ষার্থীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দেরি, ক্লাস শিডিউল ঠিক রাখতে না পারা, শিক্ষকদের যথাযথ সমন্বয় করতে না পারা এসব সমস্যা ঢাবির বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিকল্প পথ এবং নীতিনির্ধারণ প্রয়োজন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিল করা জরুরি কি না, তা নির্ধারণ করতে হলে প্রশাসনকে সতর্কভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রথমত, প্রশাসনিক দায়িত্ব বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, যদি এই অধিভুক্তি বাতিল করা হয়, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে তা নিয়েও চিন্তা করতে হবে। অধিভুক্তি বাতিলের ফলে কলেজগুলোকে একটি নতুন কাঠামোর অধীনে আনা যেতে পারে। বিশেষ করে, নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা যেতে পারে, যা এই কলেজগুলো পরিচালনা করবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং শিক্ষার মানও উন্নত হতে পারে। আরেকটি বিকল্প হলো, কলেজগুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। ফলে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে এবং ঢাবির ওপর চাপ কমবে। স্বায়ত্তশাসিত কলেজগুলোও নিজেদের মতো করে শিক্ষার মান উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করতে পারবে।
শেষ কথা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিল করার দাবি একটি যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী বিষয়। এর পক্ষে যে সব যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রতিফলন নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষার মান এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের জটিলতা। যদি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ এই অধিভুক্তি বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়া কেবলই সময়ের বিষয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mehedyhasanmiraz56@gmail.com