স্থিতিশীলতায় চাই খাদ্য সুরক্ষা

ভারত থেকে খাদ্যদ্রব্য আমদানি না করলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে? বাস্তবতা বলছে আমাদের দেশকে সেখান থেকে চাল ছাড়াও গম, পেঁয়াজ, মরিচ, ডাল, চিনিসহ ৪০ শতাংশ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে হয়। আসল কথা হচ্ছে, বিভিন্ন পণ্যে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। যে কারণে ভারত-নির্ভরতা কাটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ঊর্ধ্বমুখী চালের দাম নিয়ন্ত্রণে চালের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে আমদানির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন বন্দরের আমদানিকারকরা। তবে চাল রপ্তানিতে ভারত সরকার ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য বেঁধে দেওয়ায় আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা মূলত ভারত থেকে চাল আমদানি করেন। ২০২৩ সালের ২২ জুলাই জানা যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ ভারত বিশ্ববাজারে চাল রপ্তানিতেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে কম দামে আমিষযুক্ত গমের সবচেয়ে বড় উৎস ইউক্রেন থেকে ওই খাদ্যপণ্য আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। খাদ্যশস্য রপ্তানি নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যে সমঝোতা ছিল, তা নবায়ন না হওয়ায় ওই সংকট তৈরি হয়েছিল। আবার গত সেপ্টেম্বরে চাল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল ভারত। তখন জানা গিয়েছিল, দেশটির রপ্তানিকারকরা বাসমতী চাল ছাড়া অন্য সব ধরনের চাল রপ্তানি করতে পারবে। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে যে মোটা চালের চাহিদা বেশি, বর্তমানে খুচরা বাজারে সেই চালসহ সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। এটা শুধু দিনাজপুরের কথা নয়। পুরো দেশেই একই অবস্থা। ঊর্ধ্বমুখী চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানি শুল্ক কমিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে আমদানির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন বন্দরের আমদানিকারকরা। তবে চাল রপ্তানিতে ভারত সরকার ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য বেঁধে দেওয়ায় আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে শনিবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, হঠাৎ চালের দাম বাড়ার ফলে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে ২০ অক্টোবর আমদানি শুল্ক ৬২ দশমিক ৫  থেকে কমিয়ে ২৫ ভাগ করেছে সরকার। এতে চাল আমদানির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন বন্দরের আমদানিকারকরা। তবে শুল্ক কমালেও চালের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য ৪৯০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছে ভারত। এতে চাল আমদানি করতে চাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।

ভারত চাল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করায় বিশ্ববাজারে চালের দাম কমছে।  বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় চালের দাম কমছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমছে খাদ্যে। চালের আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের পরের চারটি অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালে এ চার  দেশ সম্মিলিতভাবে যত চাল রপ্তানি করে, ভারত একাই তার চেয়ে বেশি করে। ভারত সব মিলিয়ে ১৪০টি দেশে চাল রপ্তানি করছে। সেই কারণে ভারতের চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে চালের দামে প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। চলতি অক্টোবরেই যেভাবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর নানা কারণে দিনের পর দিন বন্ধ থেকেছে, তা অল্প কয়েকদিনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ আবারও কমে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ‘অবাধ বাণিজ্য চুক্তি’ (ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা ‘সেপা’) নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছিল, এখন তার ভবিষ্যৎ নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় দ্রব্যমূল্য বেড়েছে লাগামহীনভাবে। গম বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য। দেশে শ্রমিকদের প্যাকেটজাত রুটি দেওয়ার প্রচলনও বেড়েছে। বাংলাদেশের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি গম আসে ভারত থেকে। ভারত থেকে খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা কোনো সমস্যা হলে চোরাকারবার বাড়বে। বাড়বে সীমান্তে অপরাধ। বাংলাদেশের উচিত হবে, অন্যান্য দেশ থেকে সুলভে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য আমদানির রাস্তা প্রস্তুত করা। বিশেষ করে, খাদ্য সুরক্ষার জন্য কূটনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, সর্বস্তরের মানুষের জন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।