ক্ষমতার ভারসাম্য

তত্ত্ব কথা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য। দেশের জনকল্যাণের কথা চিন্তা করলে, সামষ্টিক মঙ্গলনীতিকে সমর্থন করার বিকল্প নেই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ চাইলে, রাষ্ট্রক্ষমতাকে দলীয়ভাবে কুক্ষিগত করার সুযোগ থাকে না। একাত্তরের যুদ্ধ জয়ের মূল শক্তি ছিল প্রশ্নহীন জাতীয় ঐক্য। আমরা সেই ঐক্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। যে কারণে দেশের মানুষকে অসংখ্যবার বেঁচে থাকার তাড়না থেকে, নিজের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। এবার সুযোগ এসেছে, নিজেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার। যেখানে দেশের সর্বস্তরের মানুষের অধিকার থাকবে। কী কারণে এখনো তা হয়নি, তার মূল বিষয় নিহিত রয়েছে আমাদের শাসনব্যবস্থার মধ্যে।

পৃথিবীর উন্নত ও অনুসরণযোগ্য অসংখ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ রয়েছে। যে কারণে আমাদের দেশেও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ করার দাবি জোরালো হচ্ছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হবে, কোন পদ্ধতিতে হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনের রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি। বিএনপি বলছে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ তৈরি হলে সংসদে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। সংসদে ভারসাম্য আসবে। অনেক আইনবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বুদ্ধিজীবীরাও একই কথা বলছেন। তারা বলছেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ একটি দেশের সুশাসন, জবাবদিহিতা ও গণতন্ত্র সুসংহত করে।  তবে কেউ কেউ বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিরোধী। তাদের যুক্তি, প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ যেসব দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রচলন রয়েছে, সেসব দেশ বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনের দিক থেকে অনেক বড়। ওই সব দেশে প্রাদেশিক সরকার রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আয়তনের দিক থেকে ছোট। এখানে প্রাদেশিক ব্যবস্থা নেই। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য ভৌগোলিকভাবে ৮টি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে।

বিশে^র অসংখ্য দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ কার্যকর রয়েছে। বিশ্ব নেতৃত্বদানকারী প্রায় সব দেশেই চলছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ করার জন্য বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি সাবেক মন্ত্রী আ স ম আব্দুর রব গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। হালে তার দাবি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। যার প্রমাণ দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানন তারেক রহমানসহ বিভিন্ন মহল থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের দাবি তোলা হয়। এই দাবির সপক্ষে শক্তিশালী যুক্তি হচ্ছে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ হলে দেশের আইনসভায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের রাখা যাবে। আর দলীয় একাধিক ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও মনোনীত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘আমাদের যে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, সেখানে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে স্পষ্ট বলা আছে। অন্য আরও অনেক দলের সঙ্গে কথা বলেই এ সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে। আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু হলে সব দলেরই প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সে ক্ষেত্রে আনুপাতিক পদ্ধতির প্রয়োজন হবে না।’  ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন হলে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ও কাজের ধারার আমূল পরিবর্তন হবে। জাতীয় সংসদ সদস্যদের আর্থিক ও নানা প্রাধিকার পরিবর্তিত হবে। জাতীয় সংসদ সদস্যের সব কাজ হবে জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনায় রেখে, এখানে দলীয় ও ব্যক্তি বিবেচনা আসতে পারবে না এবং সব কাজ হবে সংসদকেন্দ্রিক।’

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ আইনের গুণগতমান উন্নত করে এবং স্বৈরাচার দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যখন ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিভিন্ন অঞ্চলের স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই ব্যবস্থার মধ্যে কোনো সমস্যা থাকলে, তা সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের পরিবর্তিত আশা এবং ভাষার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণের কল্যাণমূলক চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে এই যাত্রা অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। দেশের সাফল্য এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতার ভারসাম্য আনাই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব।