অস্বাভাবিক এক সময়ে অস্বাভাবিক সব ঘটনা ঘটছে। আমাদের অতি আপনজন হায়দার আনোয়ার খান জুনো অসুস্থ ছিল, তাই বলে এত দ্রুত চলে যাবে এ আমরা কেউ ভাবিনি। অস্বাভাবিক ঘটনা এটাও যে তার স্মরণসভায় আমার সভাপতিত্ব করার কথা, অথচ বয়সের কারণে আমি তাতে উপস্থিত থাকতে পর্যন্ত পারিনি। বয়সে সে আমার চেয়ে ছোট ছিল, আমার স্মরণসভাই আগে হওয়ার কথা, অথচ তার স্মরণসভা আগে হচ্ছে। এবং বয়সের কারণেই আমি তাতে অনুপস্থিত থাকতে বাধ্য হলাম।
করোনা প্রাণহরণ করেছে। আমাদের প্রত্যেকেরই আপনজনদের কেউ না কেউ চলে গেছেন। আমার আপন ভাইদের একজন, যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেবল ভাইয়ের নয়, ছিল বন্ধুরও, সেও চলে গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে। জুনোও আমার নিজের ভাইয়ের মতোই ছিল। ঘটনাক্রমে ঢাকা শহরে আমরা একই স্কুলে, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি; কিন্তু আত্মীয়তার কারণটা সামাজিক বা বিদ্যায়তনিক ছিল না, ছিল মতাদর্শিক। কেবল আমার নয়, এদেশের বামগণতান্ত্রিক আন্দোলনের বহু, অসংখ্য মানুষেরই আপন ভাই ছিল আমাদের এই বন্ধুটি। অজাতশত্রু মানুষ সমাজে যে নেই এমন নয়; কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আন্দোলনের ব্যাপারে অনমনীয় এবং দল ও মতের সীমা অতিক্রম করে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে জুনো ছিল একটি দৃষ্টান্ত। কার্ল মার্ক্সের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বলেছিলেন যে মতাদর্শগতভাবে মার্ক্সের বিরুদ্ধে অনেকেই ছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু একজনও ছিল কি না সন্দেহ; একই কথা খাঁটি মার্ক্সবাদী হায়দার আনোয়ার খান জুনো সম্পর্কেও সত্য।
লড়াকু ছিল। লড়ছিল সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল বৈজ্ঞানিক, আবার একই সঙ্গে আবেগে সমৃদ্ধ। ওরা দুই ভাই, হায়দার আকবর খান রনো ও হায়দার আনোয়ার খান জুনো, দুজনেই ছিল অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। দুজনেই পদার্থবিজ্ঞান পড়েছে। দুজনেই ওই বিষয়ে বই লিখেছে। দুই ভাইয়ের পক্ষেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াটা বেমানান হতো না; শিক্ষক হওয়া সম্ভবও ছিল, কিন্তু তারা সে-পথে যায়নি। চলে গেছে রাজনীতির কঠিন ও কঠোর পথে। দুজনেই সার্বক্ষণিক ছিল রাজনীতিতে।
একাত্তরে দুজনেই যুদ্ধ করেছে। তাদের জন্য সেটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। যুদ্ধটা যে অবশ্যম্ভাবী সেটাও তারা আগেভাগে বুঝতে পেরেছিল; জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা যেটা বুঝতে চায়নি। যুদ্ধ যখন শুরু হলো রনো চলে গেল সীমান্ত অতিক্রম করে; জুনো রইল দেশের ভেতরেই। জুনোরা যুদ্ধ করেছে নরসিংদীর শিবপুরে। যার ওপরে জুনোর চমৎকার একটি বই আছে। টুকরো টুকরো স্মৃতিলিখনও আছে, দুয়েকটি আমরা প্রকাশও করেছি আমাদের নতুন দিগন্ত পত্রিকাতে। মুক্তিযুদ্ধ তো দেশের ভেতরেই হওয়ার কথা ছিল; সীমান্তের বাইরে থেকে সাহায্য-সহযোগিতা অবশ্যই দরকার হতো, যেমন দরকার ছিল আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতার; সব মুক্তিযুদ্ধেই যেমনটা ঘটে থাকে। জুনোদের শিবপুরের যুদ্ধটা বাংলাদেশ জুড়েই হতে পারত, হওয়াটা উচিত ছিল, বামপন্থিদের একটা অংশ সেভাবেই লড়েছে; যেমন লড়েছে জুনোরা। কিন্তু বামপন্থিরা বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, এক সঙ্গে লড়তে পারেনি, কোনো কোনো মহলে পথভ্রান্তিও দেখা দিয়েছিল।
স্বাধীনতার কথা প্রকাশ্যে মওলানা ভাসানীই প্রথমে এবং অতি উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন; আগাগোড়া তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, পুঁজিবাদবিরোধী অবস্থানে ছিলেন, তাকে সামনে রেখে বামপন্থিরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিলে ইতিহাস যথার্থ মুক্তির দিকে বাঁক নিতে পারত। ভাসানী সেটা চেয়েছিলেন, কিন্তু বামপন্থিদের অনেকেই চায়নি। জুনোরা কিন্তু মওলানার সঙ্গেই ছিল। জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার আওয়াজ তারা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিল; ‘কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’, এই রণধ্বনিও তাদেরই কণ্ঠেই শোনা গেছে।
ভাসানী দেশের ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, ভারতে যাবেন এমন কথা ভাবেননি, প্রয়োজনে হয়তো লন্ডনে গিয়ে প্রবাসী বিপ্লবী সরকার গঠন করতেন। কিন্তু তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন; জুনোরা চেষ্টা করেছে, কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেনি। যুদ্ধের সময়ে জুনো আগরতলায় গিয়েছিল, অস্ত্র সংগ্রহ করবে বলে; গিয়ে দেখে ভারত সরকার যুদ্ধে সহায়তা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বামপন্থিদের ঢুকতে দিচ্ছে না। ভারত সরকারের শঙ্কা ছিল বামপন্থিরা যুক্ত হলে নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত বামধারাতেই চলে যাবে, এবং যুদ্ধ ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘস্থায়ী হবে। সেটা তাদের জন্য বাঞ্ছনীয় ছিল না। জুনো অস্ত্র সংগ্রহ করবে কি, গ্রেপ্তার এবং প্রাণহানির পরিবেশ দেখে দ্রুত দেশে ফিরে এসেছে। স্বাধীনতার পরে তারা চেষ্টা করেছে সমাজ বিপ্লবের রাজনীতিকে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী করতে; কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি।
রনো ও জুনো দুজনেই রাজনীতির লোক ছিল, লোক ছিল সংস্কৃতিরও। সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি যে সাংস্কৃতিক আনুকূল্য ভিন্ন এগুতে পারে না, এমনকি গঠিত হতেই অক্ষম হয়, জুনোরা সেটা খুব ভালোভাবে জানত। স্বাধীনতার পরে আশির দশকে এসে হায়দার আনোয়ার খান জুনো দেখল বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার পক্ষে ভালোভাবে কাজ করবার জায়গাটা প্রত্যক্ষ রাজনীতি নয়, বরং সংস্কৃতি। জুনো ফ্রন্ট বদল করল, কিন্তু লড়াইতে রয়ে গেল সেই আগের মতোই। সংস্কৃতির ব্যাপারে তার আগ্রহ ছিল শুরু থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে সে যুক্ত ছিল ছাত্রজীবনেই, পরে যোগ দিয়েছে ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র সঙ্গে, আরও পরে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেছে ‘সৃজন’ এবং পরবর্তী সময়ে ‘গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’ গঠনে। জুনো নিজে বই ও প্রবন্ধ লিখেছে; লিখেছে উপন্যাসও। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বচ্ছ, আবেগ অত্যন্ত গভীর, কিন্তু সংযত।
এক সময়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে-অসুখটা কঠিন এবং নিরাময়ের অযোগ্য। কিন্তু জুনোকে আমরা দমতে দেখিনি, দেখিনি আত্মকরুণাকে প্রশ্রয় দিতে। বিপ্লবীদের মস্ত বড় গুণ পরাভব না-মানা। সেই বোধ সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল আমাদের এই সহযোদ্ধার। যুদ্ধক্ষেত্রে কঠিন বিপদে যেমন, শারীরিক অসুস্থতাতেও তেমনি, অপরাজেয় ছিল মনোবলে এবং একই সঙ্গে অনমনীয় ছিল সমাজ বিপ্লবের প্রতি অঙ্গীকারে। নিজে অসুস্থ, একমাত্র ভাই ও নিকটতম বন্ধু রোগাক্রান্ত, মা চলে গেলেন, স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ল। কিন্তু জুনোর চোখে-মুখে অভিব্যক্তিতে, ভাষায় কখনো কোনো অভিযোগ দেখিনি। কেউ দেখেনি। কর্মজীবনে সর্বক্ষণ যুদ্ধে ছিল, যুদ্ধরত অবস্থাতেই চলে গেল।
পারিবারিক আনুকূল্য পেয়েছিল। তার খ্যাতনামা মাতামহ রাজনীতির মানুষ ছিলেন, দেশভাগকে তিনি সমর্থন করেননি এবং দেশভাগের নির্মম সেই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যুক্ত হয়েছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। দুটি মাত্র সন্তান, তাদের উভয়েরই কমিউনিস্ট হওয়াকে মাতা সক্রিয়ভাবেই সমর্থন করতেন; মনে করতেন তারা ঠিক পথেই এগুচ্ছে। পিতার সহযোগিতাও ছিল অকুণ্ঠ। একাত্তরের যুদ্ধে পিতা-মাতা দুজনেই চলে গেছিলেন জুনোদের মুক্তাঞ্চলে। কিন্তু কেবল আনুকূল্যেই যে পথ তৈরি হয় না, পথ তৈরিতে ব্যক্তিরও ভূমিকা থাকে; জুনোর সেই ভূমিকাটি ছিল। মনের জোর ছিল অসাধারণ। বিতৃষ্ণা তার কোথাও কখনো কেউ দেখেনি।
ছয় বছর আগে আমি একটি বই উৎসর্গ করেছিলাম দুই ভাই রনো ও জুনোকে। বইয়ের নাম ‘কালের সাক্ষী’। উৎসর্গলিপিতে ওই দুই ভাইকে বলেছিলাম তাদের কালের উজ্জ্বল প্রতিনিধি। এখন বুঝতে পারছি লেখা উচিত ছিল ‘কাল-বদলের সাহসী যোদ্ধা’। তাদের ওই সাহসটা অতিনাটকীয় নয়, বিশেষ মুহূর্তের নয়, সার্বক্ষণিক ও সতত প্রবহমান। জুনোকে তো আগে থেকেই জানতাম। বিশেষভাবে দেখেছিলাম মওলানা ভাসানীর এক স্মরণ অনুষ্ঠানে। জুনো ছিল উদ্যোক্তাদের একজন। দেখলাম ঋজু সাবলীল হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিটি যেন সবাইকে ছাপিয়ে উঠেছে। অঙ্গীকারে যেমন, উদ্যমেও তেমন। ব্যস্ত, কিন্তু বিব্রত নয়। ওই ছবিটি এখনো দেখতে পাই। ছবিটিতে শুধু যে জুনোকে দেখি তা নয়, দেখি সমাজ-পরিবর্তনকামী সব মানুষের মুখচ্ছবি।
মুখকে মুখোশে ঢেকে ফেলার সময় চলছে এখন। বলা হচ্ছে এটা সাময়িক। করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে ঠিকই, তবে আরও ভয়ংকর বিপদ আসার আশঙ্কা যে ঘুচে যাবে তা নয়, সেটি থাকবে, এবং সে-বিপদের মোকাবিলা করতে হলে শুধু বিপদকে নয়, যে বিশ্বব্যবস্থা থেকে বিপদের পর বিপদের উদ্ভব তাকে পাল্টে ফেলা চাই। চাই বিচ্ছিন্নতা হটিয়ে সংলগ্ন হওয়া, ঐক্য গড়ে তোলা। বৈপ্লবিক আন্দোলনকে বেগবান ও সর্বত্রবিস্তৃত করা।
ওই আন্দোলন যত এগুবে হায়দার আনোয়ার খান জুনো ততই জীবন্ত হয়ে উঠবে। তার মুখের অনাবিল হাসিটি সবার হাসিতে পরিণত হবে। এবং তাকে স্মরণ করা অনুষ্ঠানের ব্যাপার হবে না, ব্যাপার হবে প্রাণের প্রতিধ্বনির। ওই আগামীকালের জন্যই জুনোরা লড়েছে। এই লড়াই জয়ী হোক। ২৯ অক্টোবর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ করার পাশাপাশি হায়দার আনোয়ার খান জুনোর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রইল। আপনাদের সবার যেমন, তেমনি আমারও।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়