তুরুপের তাস অভিবাসীদের ভোট

আর ৮ দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছে নতুন প্রেসিডেন্ট। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হওয়ার পর থেকে কমলা হ্যারিস প্রত্যেকটি জরিপে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো কমলাকে পেছনে ফেলেছেন ট্রাম্প। ফলে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। ট্রাম্পকে জেতাতে পৃথিবীর শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (প্রাক্তন টুইটারে) জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস কমলা হ্যারিসের নির্বাচনী তহবিলে ৫০ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন। রাজনীতি থেকে বরাবরই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলেও গেটস মনে করছেন, এবারের নির্বাচন একেবারেই ভিন্ন। নিরপেক্ষ বা নীরব থাকার সুযোগ নেই। আরেক ধনকুবের জেফ বেজোস আবার নীরব থাকার কৌশলই বেছে নিয়েছেন।

দ্বিধাবিভক্ত জনগণ ও গণমাধ্যম

মার্কিন গণমাধ্যমে শনিবার থেকে তোলপাড় চলছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট সেদিন জানিয়ে দেয়, এই নির্বাচনে তারা কোনো প্রাথীকেই সমর্থন দেবে না। অর্থাৎ পত্রিকাটি কমলা হ্যারিসের পক্ষে সরাসরি দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিল না। উদারপন্থি গণমাধ্যম কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রত্যাশিতভাবেই পত্রিকাটির সম্পাদক ও মালিক পক্ষকে তুলোধোনা করছেন। পত্রিকাটির এডিটর-অ্যাট লার্জ রবার্ট কাগান বছরখানেক ধরে নানান যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হলে আমেরিকার গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে ফেলবেন, তাই এই স্বৈরশাসককে থামাতে হবে। তিনি শুক্রবার রাতেই পদত্যাগ করেছেন। পত্রিকাটির দুই কিংবদন্তি সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড এবং কার্ল বার্নস্টাইনও বিস্ময় ও উষ্মা প্রকাশ করেছেন। সত্তরের দশকে ওয়াটারগেট কেলেংকারির ওপর তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। উডওয়ার্ড ও বার্নস্টাইন প্রশ্ন তুলেছেন, যে পত্রিকাটি প্রশাসনের শীর্ষ মহলের চাপ উপেক্ষা করে গণতন্ত্র রক্ষায় বারবার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, তারা দেশের এই ক্রান্তিকালে ট্রাম্পের অনুকূলে যাবে এমন সিদ্ধান্ত কীভাবে নিল?

ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন পোস্টের এই সিদ্ধান্তের পেছনে পত্রিকাটির মালিক ও অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা বেজোসের হস্তক্ষেপ রয়েছে। তার মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিনের নির্বাহীদের সঙ্গে শুক্রবার ট্রাম্প সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন। তারপরই পত্রিকাটি কমলা হ্যারিসকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। একাধিক বক্তৃতায় ট্রাম্প তার বিরোধীদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। বেজোস তার ব্যবসায়িক বিনিয়োগ রক্ষা করতে তাই ট্রাম্পের চক্ষুশূল হওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি নন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও একনায়কতন্ত্রের ইতিহাস-বিষয়ক সাড়া জাগানো বই অন টির‌্যানি-র লেখক টিমোথি স্নাইডার সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যা ঘটছে তা হলো ট্রাম্পের বিজয় আঁচ করে সংবাদপত্রের মালিকরা তার প্রতি আগাম আনুগত্য প্রকাশ করছে। এর পরিণাম হবে সাংঘাতিক।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি প্রভাবশালী সংবাদপত্র লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসও কমলাকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সম্পাদনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করেছেন। পত্রিকাটির মালিক জৈবপ্রযুক্তি খাতের বিলিয়নিয়ার প্যাট্রিক সুন-শিয়ং। তার মেয়ে নিকা অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে জানান, মূলত গাজা ইস্যুতে কমলার অবস্থানের কারণেই লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস তাকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিচ্ছে না। তার বাবা দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শাসনামলে ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন হিসেবে সোয়েটো-তে কাজ করেছেন। তার এই সিদ্ধান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে ভোট নয়। বরং শিশুদের ওপর চলমান একটি যুদ্ধের তদারকি করছে এমন একজন প্রার্থীকে সমর্থন জানানো থেকে বিরত থাকা।

গাজা ইস্যুতে মুসলিম ভোটাররা ইতিমধ্যেই বাইডেন প্রশাসনের ওপর বেজায় নাখোশ হয়ে আছে। ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধে বা যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করতে বাইডেন প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ তো নেয়ইনি, উল্টো ইসরায়েলকে দরাজহস্তে মারণাস্ত্র ও অর্থের জোগান দিয়েছে। মুসলিম ভোটাররা বিশেষত আরব-আমেরিকানরা মনে করছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলা হ্যারিস এর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।

সবার চোখ মিশিগানের দিকে

২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বাইডেনের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মিশিগানের মুসলিম ভোটাররা। অস্কারজয়ী নির্মাতা ও রাজনৈতিক কর্মী মাইকেল মুর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, গত নির্বাচনে আরব-আমেরিকান ও মুসলিমদের ৭০ শতাংশ বাইডেনকে ভোট দিয়েছিল। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাইডেনের জনসমর্থন নেমে এসেছিল ১২ শতাংশে। কমলা প্রার্থী হওয়ার পর সেটা বেড়ে ৪৩ শতাংশে উঠলেও ট্রাম্পকে হারানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। মিশিগানের বহু আরব-আমেরিকান এই যুদ্ধে আত্মীয়স্বজন হারিয়েছে। গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে যাদের পরিবার ও বন্ধুবান্ধব এখনো আছে, তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জোর সম্ভাবনা হলো, আরব-আমেরিকান নাগরিকরা ভোট দিতে যাবেন না, গেলেও তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে ভোট দেবেন।

আরব-আমেরিকানদের সমর্থন ছাড়া মিশিগানে কমলা জিততে পারবেন না। তাই দুটোর যে-কোনোটি ঘটলে ট্রাম্পের পোয়াবারো। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিশেল গোল্ডবার্গ নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ডেমোক্র্যাটদের হুঁশিয়ার করেছেন, মিশিগান খোয়ালে হোয়াইট হাউজও খোয়াবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে দুই দলই মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ১৫টি ইলেক্টোরাল ভোট বাগিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পবিরোধী রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ লিজ চেনিকে সঙ্গে নিয়ে কমলা সভা করেছেন। শনিবার আরেকটি জনসভায় তিনি হাজির হন সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে নিয়ে। তরুণ ও নারীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় মিশেল আগামী নির্বাচনে কমলা হ্যারিসকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। সিদ্ধান্তহীনতায় আক্রান্ত মার্কিন ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য ডেমোক্র্যাট শিবির সেলিব্রেটিদেরও নিয়োগ করেছে। যেমন বিয়ন্সে, টেইলর সুইফট, ব্রুস স্প্রিংসটিন, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও কমলার পক্ষে ভোট চাচ্ছেন।

তবে আরব-মুসলিম ভোটারদের বিমোহিত করতে সেলিব্রিটি কার্ড খুব একটা কাজে আসছে না। শনিবার মিশিগানের জনসভায় কমলা ভাষণ শুরু করতেই দর্শকসারি থেকে রব ওঠে: গাজা যুদ্ধ বন্ধ করো। জবাবে কমলা বলেন, এই যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং জিম্মিদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে হবে। ৪৩ হাজার নিহত ফিলিস্তিনির ব্যাপারে একটি শব্দও ব্যয় না করে ইসরায়েলি জিম্মিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ মিশিগানে কমলার জনপ্রিয়তা মোটেই বাড়াবে না। তার জন্য আরও দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, সেদিনই অঙ্গরাজ্যটির প্রভাবশালী কয়েকজন আরব-মুসলিম নেতা ট্রাম্পের পক্ষে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।

মিশিগানে ট্রাম্প জিতলে, নর্থ ক্যারোলিনা বা জর্জিয়াতে কমলাকে অবশ্যই জিততে হবে। সমস্যা হলো, জর্জিয়াতে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৭১ হাজার আরব ও মুসলিম রয়েছে। ২০২০ সালে বাইডেন মাত্র ১২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জর্জিয়ায় ট্রাম্পকে পরাজিত করেছিলেন। জর্জিয়ার আরব-মুসলিম ভোটাররা যদি এবার ট্রাম্পকে সমর্থন দেয়, কমলার প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

দোদুল্যমান সাত অঙ্গরাজ্য

দোদুল্যমান সাতটি অঙ্গরাজ্যের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে হোয়াইট হাউজের পরবর্তী বাসিন্দা কে হবে। এগুলো হলো অ্যারিজোনা, জর্জিয়া, মিশিগান, নেভাদা, নর্থ ক্যারোলিনা, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিন। এই ৯৩টি ইলেক্টোরাল ভোট কোন পক্ষে যাবে নির্বাচনের সাত দিন আগে এসেও কোনো দলই সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে না। এবারের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য হতে যাচ্ছে পেনসিলভানিয়া। জুলাই মাসে এখানেই এক আততায়ী প্রকাশ্য জনসভায় ট্রাম্পকে হত্যা করার চেষ্টা করে। রক্তাক্ত ট্রাম্পের মুষ্টিবদ্ধ ছবি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়েছিল। তার জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে উঠেছিল। কয়েকদিন পর বাইডেন নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ান। পেনসিলভানিয়ার বড় শহরগুলোতে কমলা এগিয়ে থাকলেও প্রান্তিক এলাকায় ট্রাম্পের পক্ষে পাল্লা ভারী। হাডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে। 

অভিবাসী সমস্যা প্রভাবিত করবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র অ্যারিজোনার ফলাফল। মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী এই রাজ্যটিতে ২০১৬ সালে ট্রাম্প জিতলেও ২০২০ সালে মাত্র ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন। এবার তার আশাবাদী হওয়ার কারণ হলো অ্যারিজোনায় অভিবাসীপ্রত্যাশীদের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাইডেন প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। অভিবাসীপ্রত্যাশীদের কারণে রাজ্যটির অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে সীমান্তে দেয়াল আরও উঁচু করবেন এবং অনুপ্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাবেন।

ট্রাম্প এগিয়ে আছেন নেভাদা, নর্থ ক্যারোলিনা ও জর্জিয়াতেও। অথচ আগস্ট-সেপ্টেম্বর জুড়ে অধিকাংশ দোদুল্যমান রাজ্য কমলার পক্ষে ছিল। বর্তমানে কেবল উইসকনসিন ও মিশিগানে তিনি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। লক্ষণ যা দেখা যাচ্ছে, মিশিগানও কমলার হাতছাড়া হতে চলেছে। দ্য ইকোনমিস্ট-এর সর্বশেষ পূর্বাভাস-সহ সাম্প্রতিক জরিপগুলো অনুযায়ী, হোয়াইট হাউজে দ্বিতীয়বারের মতো ফিরছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এত তীব্র যে, ৫ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

লেখক: অনুবাদক

rezwanur1991@gmail.com