আমাদের শেয়ারবাজারে বিশৃঙ্খলা চলছে অনেকদিন ধরে। এই খাত থেকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। দীর্ঘ সময়ে শেয়ারের দরপতন হয়েছে অনেকবার। অপরাধীরা প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত হওয়ার পরও, তখন সরকার থেকে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে শেয়ার দুর্বৃত্ত দল হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য। তবে সরকার পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। যার প্রভাবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরবর্তী চার কার্যদিবসে বড় উত্থান দেখা দিয়েছিল। তবে এসইসিতে কমিশন পুনর্গঠনের পর আবারও পতন ধারায় নেমে আসে বাজার। এরপর গত আড়াই মাসে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন হয়েছে। নিঃস্ব হয়ে গেছেন অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ না নিয়েই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মতো এসইসির কঠোর সিদ্ধান্তের কারণেই এই অবস্থা। একই সময়ে অনেকগুলো কোম্পানির শেয়ার কারসাজিসহ নানা অনিয়ম খতিয়ে দেখতে একাধিক তদন্ত কমিটি করা হয়। যার ফলে পুরো বাজারেই ভীতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীরা শাস্তির মুখে পড়তে পারেন, এমন আশঙ্কায় বাজার ছাড়তে শুরু করেন। বড় ধরনের দরপতনের এটিই অন্যতম কারণ। গত আড়াই মাসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক প্রায় ১৬ শতাংশ কমে গেছে। এ বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে- ঋণ নিয়ে কেনা শেয়ারগুলো এখন ট্রিগার সেল বা ফোর্সড সেলের (বাধ্যতামূলক বিক্রি) আওতায় বিক্রি হচ্ছে। এতে যেসব বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণ নিয়েছিলেন, তারা পুঁজির প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন। বিপরীতে শেয়ার কেনার মতো পর্যাপ্ত বিনিয়োগ বাজারে নেই। ফলে আড়াই মাস ধরে চলমান দরপতন এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ট্রিগার সেলের ভয়াবহতায় রবিবার এক দিনেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩ শতাংশ কমে গেছে। গতকালও পতন ধারা অব্যাহত ছিল।
অতীতে কোনো সরকারই পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেনি। নতুন সরকারে তিনজন বড়মাপের অর্থনীতিবিদ থাকার পরও পুঁজিবাজার তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি বলে বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন। শেয়ারবাজার পতনের জন্য বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। বলছেন- ব্যাংক খাতে উচ্চসুদের হার, মার্জিন ঋণের বিপরীতে কেনা শেয়ার বিক্রি, একের পর এক শ্রমিক অসন্তোষ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়াসহ কিছু কারণে শেয়ারবাজারে টানা দরপতন চলছে। একদিকে ব্যাংকের সুদের হার বেড়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধা নেওয়া ব্যবসায়ীরা বাজারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। ফলে বাজারে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে শেয়ারবাজারে টানা দরপতন হচ্ছে।
পতনের কারণ অনুসন্ধানে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং এই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছে এসইসি। কিন্তু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বলছেন সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজার নিয়ে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা যায়নি। আগের সরকারের আমলে মন্দা থাকার পরও পুঁজিবাজারে মূলধনী মুনাফার ওপর যে করারোপ করা হয়েছিল, তা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। যদিও স্টেকহোল্ডারররা গত এক বছর ধরেই এই কর প্রত্যাহারের দাবি করে আসছেন। এদিকে ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, শেয়ার কেনার পর দাম বাড়লেই তদন্তের আওতায় নেওয়া হচ্ছে। অথচ কোনো শেয়ার বেশি পরিমাণে কিনলে দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। অবস্থা এমন হয়েছে, ঝুঁকি নিয়ে কোনো শেয়ারে পজিশন নিতে গেলেই শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন তারা। তবে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন প্রসঙ্গে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম যা জানিয়েছেন তা গতানুগতিক। বলেছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃতভাবে যদি বাজার পতনে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি বাজার সাপোর্ট দিতে আইসিবিকে ৩০০০ কোটি টাকার ফান্ড দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দূর করা সম্ভব।