জনতার শক্তির কথা ভুলে যাওয়ার পরিণতি

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন শেখ হাসিনা। এরপর আর ক্ষমতা থেকে বের হতে চাননি তিনি। একতরফা ও জালিয়াতির নির্বাচন, বিরোধী মত দমন, অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে, আমলা আর প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে নিজেকে অপ্রতিরুদ্ধ ভাবতে শুরু করেন। গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করে এই চর্চা তাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার লোভে ফেলে। তিনি ভুলে যান যে জনগণই শেষ কথা।

তার কর্মকা-ের মাধ্যমে যে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের দানা বাঁধছিল তা তিনি বুঝতে পারেননি। এ কারণে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে তার পরিণতি ডেকে আনে। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে থাকা শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। ফলে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ যে বিপর্যয়ে পড়েছিল, প্রায় ৫০ বছরের মাথায় দলটি আবার সেই অবস্থায় পড়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় শেখ হাসিনাকে লোভের মোহে ভাসায়। তার প্রথম চেষ্টা ছিল নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তবে অনেকে বিএনপির সর্বশেষ শাসনামলে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিচার অঙ্গনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার কথা স্মরণে রাখার কথা বলেন।  মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদটি বিএনপি নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে ৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার বাহানা তুলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলে তৎপর হয় আওয়ামী লীগ। যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার জন্য বিএনপি সরকারের সময় বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন করেছিল এই আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সংসদে একচ্ছত্র আধিপত্য পাওয়ায় ক্ষমতায় টিকে থাকতে নিজেদের সুবিধামতো আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হয়। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হয়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে খুব বেশি চাপে পড়তে হয়নি।

৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচার শুরু করা আওয়ামী লীগের শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি ক্ষেত্র। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং জামায়াত ও বিএনপির বড় নেতাদের শাস্তি কার্যকর আওয়ামী লীগকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ধারণা করা হয়েছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যকর করতে গেলে আওয়ামী লীগকে কঠিন মূল্য দিতে হবে, কিন্তু হয়নি। বিচার কার্যকর করতে পেরে আওয়ামী লীগ আরও শক্তি সঞ্চয় করে।

রাজনীতির মাঠে বিরোধী দলগুলোর ভুল সিদ্ধান্তগুলো আওয়ামী লীগের শক্তি বাড়িয়েছে। দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি ২০০৮-এর নির্বাচনে বড় হারের পর নিজেদের গুছিয়ে তুলতে পারেনি। এর অবশ্য একটা কারণ ছিল যে, মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচার এবং জামায়াতের সঙ্গে জোট- বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলে। আবার ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আন্দোলনের সহিংসতার দায় বিএনপির ওপর চাপানোর কৌশলে সফল হয় আওয়ামী লীগ। হামলা-মামলার মুখে নির্বাচন বাতিল করার মতো আন্দোলন গড়ে তোলা বিএনপির পক্ষে সম্ভব হয়নি। নির্বাচন হয়ে যাওয়া মানে ৫ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য লড়াই করার সুযোগ থাকে। এখানে আওয়ামী লীগ আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করে যে, বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন করলে তাদের লাভ। কারণ দেশে তৃতীয় শক্তির রাজনৈতিক দল নেই। অন্য দলগুলো নির্বাচনে এলে, বিএনপি ছাড়াই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে। অন্তত আওয়ামী লীগ বলতে পারবে বিএনপি ছাড়া সব দলের অংশগ্রহণ ছিল। এতে তাদের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ তাই করে। ২০১৮ এবং ২০২৪-এর নির্বাচনে তারা ছোট দলগুলোকে নির্বাচনে এনেছে। এতে নির্বাচন ব্যবস্থা হাস্যকর করে তোলে আওয়ামী লীগ। বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রচার করতে নিজের দলের লোকদের স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে দিয়েছে। জনগণ একে তামাশা হিসেবেই দেখেছে। ক্ষমতার মধ্যে থাকায় শেখ হাসিনা তা উপলব্ধি করতে পারেননি।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে জেলে পাঠানোর মাধ্যমে শেখ হাসিনা আরও এক শক্তি প্রদর্শন করেন। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে যে ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়ার কথা ছিল, আওয়ামী লীগের তা হতে হয়নি। কারণ ওই সময় মামলা, হামলা, গুম থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যতিব্যস্ত ছিল। সাধারণ কোনো মিটিং মিছিল থেকেও শত শত বিএনপির নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। মোট কথা বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেয়নি আওয়ামী লীগ। নামলেই গ্রেপ্তার। প্রশাসনকে বাগে রাখার কৌশল ছিল আওয়ামী লীগের বড় শক্তি। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন মূলত আওয়ামী লীগের হয়েই কাজ করেছে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ছাড়ার পর এ কারণেই পুলিশ বাহিনীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।

বাধাহীন দুর্নীতিতে আওয়ামী লীগ ছিল অপ্রতিরোধ্য। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের ছোট নেতাকর্মী থেকে বড় নেতারা জড়িয়ে ছিলেন দুর্নীতিতে। দলের নেতাকর্মীরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন, ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করেছেন। এসব তথ্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অজানা ছিল না। কিন্তু তিনি তা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখেননি। শেখ হাসিনা সব সময়ই একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য এ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরই সুযোগ করে দিয়েছেন।

প্রশাসনিক কাঠামোকে বিতর্কিত করেছেন শেখ হাসিনা। প্রতিটি স্তরে তার ও দলের আধিপত্যে দুর্বল প্রশাসন গড়ে ওঠে। বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে তিনি পুরোপুরি নষ্ট করেছেন। আওয়ামী লীগ একটি ‘একনায়কতান্ত্রিক’ সরকারে পরিণত হয়। তার সময়ে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেও আওয়ামী লীগকে যখন রাতে ভোট করে নির্বাচিত হতে হয়, তখনো শেখ হাসিনা বুঝেননি তার জনপ্রিয়তা কোথায় নেমেছে। এমনকি স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে গত ১৫ বছরে মানুষ আসলে ভোটের কোনো অধিকার পায়নি। একটি প্রাচীন রাজনৈতিক দল হিসেবে দূরদর্শিতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতার দম্ভে সেই উপলব্ধি তাদের ছিল না।

একটু পেছনে ফিরে তাকানো যেতে পারে। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি শেখ হাসিনা। ফলে দলের বড় ধরনের পতন হয় ২০০১-এর নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে পরাজয়ের পর শেখ হাসিনা দলের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু নেতাকর্মীদের অনুরোধে তিনি আবার দলের হাল ধরেন। ওই সময়  দলীয় ফোরামে দলের তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের প্রচ- সমালোচনা করেছিলেন শেখ হাসিনা। এর ফলে অনেকেই ধারণা করেছিলেন শেখ হাসিনার পরবর্তী সরকার হবে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার একটি সরকার। কিন্তু তা হয়নি। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এলে আইনের অপব্যবহার, বিরোধী মত দমন, দুর্নীতি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকে থাকার মোহে ফেলে। ক্ষমতাকে ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা সব কিছুই করেছেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হয়। ভিন্ন মতকে দমন করা স্বৈরশাসকের কাজ। ৯০-এর গণ-আন্দোলন ছিল এর বড় উদাহরণ। শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের হেনস্তা করেছেন। সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যমেও বিরুদ্ধ মত দমন করা হয়েছে কঠোর হাতে। বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, দখল নেওয়া হয়েছে অথবা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো আইন করা হয়েছে।

যেকোনো বিতর্ককে শেখ হাসিনা গায়ে মাখতেন না। উল্টো বিতর্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ছাত্রলীগের বেপরোয়া আচরণ তিনি কখনো দমাতে চাননি। তিনি ছাত্রলীগের উগ্রতাকে শক্তির উৎস মনে করেছিলেন। ১৫ বছরে বেশিরভাগ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে দিয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তারা নিজেরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের যে ক্ষমতার ভিত্তি, তার কোনোটাই টেকসই ছিল না। ফলে মানুষের একটা ক্যাটালিস্ট বা স্ফুলিঙ্গের দরকার ছিল। সেটাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়েছে। জনতার শক্তি আরও বেশি। ক্ষমতার বৃত্তে থাকলে সবাই তা ভুলে যায়। শেখ হাসিনাও ভুলে গিয়েছিলেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

akpol74@gmail.com