নতুন স্বপ্নের পথচলা

ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গণপরিবহন তথা বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এর ভেতর দিয়ে সব ধরনের ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়াও রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ অন্য সব যানবাহন চলাচল করে। এর ফলে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর ক্যাম্পাসের ওপর দিয়ে চলা ট্রেন টিএসসি স্টেশনে থামে। তথাপি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাসের ভেতর যাতায়াতের জন্য যে নিজস্ব যানবাহন ব্যবস্থা থাকা দরকার, তা শতাব্দী প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। আশার কথা হচ্ছে, চক্রাকার বাস বা শাটল বাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের সেই দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে। বুধবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, আগামী ১৫ নভেম্বর ‘গণঅভ্যুত্থানের রঙ’ লাল রঙের তিন বাস দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ স্বপ্ন চালু করার পরিকল্পনা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এটি চালু হলে ক্যাম্পাসে মাত্রাতিরিক্ত রিকশাভাড়া, জ্যাম, রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাসহ নানাবিধ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিস সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের জন্য শাটল সার্ভিস চালুর লক্ষ্যে ইতিমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে রুট ও স্টেশন নির্ধারণ করা হয়েছে। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চক্রাকারে চলবে এ বাস। ১৫ মিনিট পরপর স্টেশন থেকে ছাড়বে তিনটি বাস। প্রথম তিন মাস পরীক্ষামূলকভাবে চলবে এ সার্ভিস। এরপর শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী পরিচালনা করা হবে বলে জানায় এ দপ্তর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালকের অফিস সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের জন্য এ সার্ভিসটি চালু করতে বছরে প্রায় ৭০-৮০ লাখ টাকা খরচ হবে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস উপহার পেতেও চেষ্টা করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া চব্বিশের অভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষার্থে বাসের রঙ লাল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে শাটল বাস সার্ভিস চালু, রুট নির্ধারণ, ক্যাম্পাসে গণপরিবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ছয়টি প্রবেশমুখে ‘বার’ স্থাপনের বিষয়ে গত সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) খোন্দকার নাজমুল হাসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে। পরিবহন অফিসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাসগুলো সুফিয়া কামাল হল এবং নীলক্ষেত থেকে ছাড়া হতে পারে। চক্রাকারে বাসগুলো একুশে হল, কার্জন হল, মোকারম ভবন, কাজী মোতাহার হোসেন ভবন, টিএসসি, চারুকলা, কলাভবন, ভিসি চত্বর হয়ে নীলক্ষেত মোড়ে আসবে। এ ছাড়া নীলক্ষেত মোড় থেকে ছাড়া বাস পলাশী, ফুলার রোড, জগন্নাথ হল স্টেশনেও থামবে। চালুর আগে তিনটি বাসের জন্য চূড়ান্তভাবে রুট নির্ধারণ করা হবে এবং প্রয়োজনে সংশোধন করা হবে বলে জানায় এ অফিস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবের ইতিহাস নিয়ে আমরা গর্ব করলেও বিগত বছরে পড়াশোনার চেয়ে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি ও নেতিবাচক কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম বারবার শিরোনামে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্ররা মানবেতর জীবনযাপন করেন। গণরুম সংস্কৃতির ভয়াবহ শিকার হয়ে বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। এমনকি প্রাণহানিরও উদাহরণ আছে। রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য হওয়ায় হলে থাকা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। অথচ, দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী যারা লাখো লাখো প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়াই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন, তাদের পেছনে বছর বছর সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করে। কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের এই ভর্তুকি এই শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেন না। আবাসনের জন্য রাজনীতি করার বাধ্যবাধকতা তো আছেই, হলের ক্যান্টিনে খাবারের মান অতি নিম্ন, এমনকি লাইব্রেরিগুলোও যথেষ্ট আধুনিক নয়।

স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর দেশবাসী আশা করছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেজুড়বৃত্তিক অপরাজনীতি দূর হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। এর কিছুদিন পর দেশের একটি অঞ্চলে বন্যা হলে ত্রাণ সংগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, সংস্কৃতি ও সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ ফিরে আসা দেশের মঙ্গলের জন্য কাম্য। কেবল স্বপ্নের শাটল বাস নয়, সব ক্ষেত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার জরুরি।