জকসু নির্বাচন নিয়ে জবি প্রশাসনের তোড়জোড়

অবশেষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে গঠন করা হয়েছে ছয় সদস্যের কমিটি। এর অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। তাছাড়া এই কমিটি নির্বাচন নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি নিজেই এই কমিটির আহ্বায়ক। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. কে এ এম রিফাত হাসান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন, প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. তাজাম্মুল হক, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দীন আহমদ এবং ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৪ সালে প্রথম জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের (জকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ভিপি এআর ইউসুফ আর জিএস সালাউদ্দিন আহমেদ নির্বাচিত হন। পরে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের ১০টি কমিটি হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৭ সালে আরও চারটি ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ১৮ বছর ধরে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। আর জগন্নাথ কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার সময়ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫-এ ছাত্র সংসদের কোনো আইন হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদ অধ্যাদেশ যুক্ত ও নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি প্রশাসন।

স্বৈরাচার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে জবিসহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা হয়েছে। এরই মধ্যে জকসু যতদ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিভাগের চেয়ারম্যানও একাডেমি কমিটির মাধ্যমে প্রতি সেমিস্টারের প্রতিনিধি নির্বাচন করে তালিকা দেবেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধির বিধিবদ্ধ তালিকা এবং জকসু নির্বাচন আমরা করব। সেই তালিকা সংগ্রহ করার জন্য আমরা অলরেডি চিঠি রেডি করেছি। অ্যাকটিভ যেসব ছাত্র সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গেও আমরা আলোচনা করব। সংস্কার আন্দোলনে ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামেও একটা গ্রুপ আছে, তাদের সঙ্গে বসে আমরা কীভাবে কী করা যায়, সিদ্ধান্ত নেব।’

সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ট্রেজারার কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন বলেন, আমরা মিটিং করেছি, সেখানে নির্ণয় করেছি কোন কাজগুলো আগে করা দরকার। জকসু তার মধ্যে অন্যতম। জকসুর আইনগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় আইনে জকসু নেই, সে ক্ষেত্রে আইন সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না, আমাদের আইন উপদেষ্টারা মতামত নেবেন।’

ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. কে এ এম রিফাত হাসান বলেন, জকসু নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে নেই জকসুর কথা। প্রগতিশীল যত ছাত্র সংগঠন আছে, তাদের সবার মতামত নিয়েই জকসুর কাজ করতে হবে। এটা নিয়ে কাজ চলছে। আমরা দ্রুত হয়তো কোনো ফলাফল পেতে পারি।

ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা স্টেপ বাই স্টেপ আগাব। জকসু নির্বাচন নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করেছি। জকসু আইন নিয়ে লিগ্যাল অ্যাডভাইজারদের সঙ্গে আলোচনা হবে।’

জকসু নির্বাচন বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা অতি দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চাই। আমাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্যই ছিল বৈষম্য দূর করা। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল কোনো প্রকার দলের রাজনীতিই আমরা চাই না।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদিচ্ছা আর গুরুত্বের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জকসু নির্বাচনের মুখ দেখতে পারেনি। কিন্তু প্রশাসন চাইলে সেটা সিন্ডিকেট মিটিংয়ের মাধ্যমে সব কিছুর সমাধান করতে পারেন।’

ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. শাহিন মিয়া বলেন, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন এটি এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি হয়ে উঠেছে। যেহেতু আমরা বিশ্ববিদ্যালয় দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির ভয়াবহতা দীর্ঘদিন যাবৎ দেখে আসছি। আমরা যারা সাধারণ শিক্ষার্থী আছি, এই দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি চাই না। যত দ্রুত সম্ভব ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিয়ে সুস্থ ধারার রাজনীতি ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য আমরা আমাদের উপাচার্য স্যারকে জানিয়েছি, আগামী এক মাসের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি করার জন্য। তিনি এ ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্র সংসদ কার্যকর হবে।’

জকসু নির্বাচন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যতদ্রুত সম্ভব জকসু নিয়ে কাজ করব, নীতিমালাগুলো ঠিক করব। লিগ্যাল অ্যাডভাইজারদের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করতে হবে। যদি আইনগত বাধা না থাকে, আশা করছি কোনো আইনগত জটিলতা থাকবে না। আমরা একটা গণতান্ত্রিক অনুশীলনের চর্চা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি।’