পল্লবীতে গুলিতে গৃহবধূর মৃত্যু

স্ত্রী হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করে বিপাকে স্বামী

অবৈধ অস্ত্রধারী মাদক কারবারিদের আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির বলি গৃহবধূ আয়েশা আক্তার (২৬)। সন্ত্রাসীদের ছোড়া লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে আয়েশা মারা গেলেও বিপাকে পড়েছে পুরো পরিবার। নিহতের স্বামী বাসচালক মিরাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার স্ত্রী সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা গেল। এখন উল্টো আমি শিশু সন্তানদের নিয়ে হুমকি-ধমকির ওপর রয়েছি। এলাকায় ঢুকতে পারছি না। মামলা করার পর ফোন করে সন্ত্রাসীরা এলাকা ছাড়তে বলেছে।’

‘আমার নির্দোষ স্ত্রীকে এভাবে মেরে ফেলল সন্ত্রাসীরা। আমার দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। তাদের নিয়ে এখন কোথায় মাথা গুঁজব। আয়েশা তো চলে গিয়ে বেঁচে গেল, কিন্তু সন্তানদের ভাসিয়ে গেল’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিরাজ। তিনি আরও বলেন, ‘আমি ঢাকা মহানগরে একটি বাস চালাই। বেশিরভাগ সময় বাসার বাইরে থাকি। রাতে এলাকায় ফিরে কারোর সঙ্গে তেমন মিশিও না। তারপরও আমার ঘরেই বিপদ হানা দিল। ঘটনার সময় আমার স্ত্রী আয়েশা সেখানে যায়নি। বাসার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপরও সন্ত্রাসীদের গুলি তাকে ঝাঁজরা করল। কোথায় আমি স্ত্রী হত্যার বিচার চাইব, এখন আমারই পালিয়ে থাকা লাগছে।’

গত বুধবার বিকেলে পল্লবী বাউনিয়ার বি-ব্লকের ৬ নম্বর রোডে চাঁদার দাবিতে মাদক কারবারি মামুনকে মারধর করে ভাসানটেক এলাকার সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি মোমিনসহ আল ইসলাম ও নাসিরসহ ২০-২৫ জন। ওই সময় এলাকার লোকজন মামুনকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় তারা। তখন তাদের ছোড়া গুলিতে বাসার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তঃসত্ত্বা আয়েশা আক্তার গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ওই ঘটনায় নিহতের স্বামী মিরাজ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মোমিন, আল ইসলাম ও তার ভাই জাহাঙ্গীর এবং নাসিরসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন।

গৃহবধূ হত্যার ঘটনায় রাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলো হত্যাকা-ের নেপথ্য কারিগর আল ইসলাম ও তার সহযোগী নাসির। তারা দুদিনের পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছে। গ্রেপ্তার দুজন ছাড়াও শাবু, সম্রাট, শামীম, জয়নাল, ইদ্রিস, কালা মোতালেব, কামাল, জাহাঙ্গীর, আল ইসলাম, ভেজাল মামুন, জয়, ইউনুস, রুবেলসহ অজ্ঞাতনামা আরও অনেকে অস্ত্রধারী মাদক কারবারি মোমিনের সহযোগী হিসেবে কাজ করত।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দুই গ্রুপের মাদকের কারবার ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে সংঘটিত গোলাগুলিতে আয়েশার মৃত্যু হয়। এ হত্যাকা-ে আল ইসলামের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে পল্লবীসহ ঢাকার বিভিন্ন থানায় অস্ত্র, মাদক, জমি দখলসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।

জানা গেছে, বাউনিয়ার বি-ব্লকের ৬ নম্বর রোডে সাততলা ভবনের তিনতলায় একটি রুম নিয়ে পরিবারসহ ভাড়া থাকতেন মিরাজ। গতকাল বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে পুলিশ। তাকে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পল্লবীর বাউনিয়াবাদ এলাকায় বেড়ে ওঠা আল ইসলাম ও তার ভাই জাহাঙ্গীর একসময় ভাঙাড়ি মালপত্র কেনাবেচা করত। তবে এর আড়ালে মাদক কারবারে জড়িয়ে তাদের অর্থসম্পদ ফুলেফেঁপে ওঠে। মাদক কারবার চালানোর জন্য ৪০-৫০ জনের একটি গ্রুপ রয়েছে। মূলত তাদের দিয়ে মাদক বিক্রি ও বিরোধী বা প্রতিপক্ষদের দমন করত তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হত্যা মামলার আল ইসলাম গ্রেপ্তারে এলাকার মানুষের মধ্যে স্বস্তি নামার কথা। কিন্তু বিপরীতে বেড়েছে আতঙ্ক। যারা বিভিন্ন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা প্রতিবাদ করেছেন, তারা যেন আল ইসলাম গ্রেপ্তারের খবরে উল্লাস না করতে পারে সে বিষয়ে গ্রুপে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের দিয়ে সতর্ক করেছে। আগের মতোই সবকিছু চলবে বলে হুমকি দিয়েছে জাহাঙ্গীর। বাড়াবাড়ি করলে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হবে। সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীরকেও গ্রেপ্তারের দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ মাকছেদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আল ইসলামের বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। গুলিতে গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। এ ছাড়া আরও কয়েকজনের নাম জানা গেছে। এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।