অনেকেই বলেন- আমাদের দেশে আইনের ব্যবহার হয়, সবলের হাতকে আরও শক্তিশালী ও দুর্বলকে শাসন করার জন্য। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত প্রায় সব আইনই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের হাত থেকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য একটি বিধান থাকত। যদিও ১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো অপরাধ করলে তাদের শাস্তি প্রদানেরও ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশরা রাজকর্মচারী ও সেবকদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখার একটা চেষ্টা করত নিজেদের স্বার্থেই। কিন্তু ব্রিটিশ বিদায়ের এতদিন পরও অনেক দুর্নীতিবাজ সরকারের প্রভাবশালীর সহযোগিতায় এখনো আইনের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সফলও হন।
দুর্নীতি একটি বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে রাজনৈতিক শুদ্ধাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকলে দুর্নীতির মূল উৎপাটন অসম্ভব।
একসময় সরকার বলেছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার কথা। সেটি যতটা সময়োপযোগী ও যৌক্তিক ছিল, তার বাস্তবায়ন ছিল ততটাই কঠিন ও জটিল। বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং শাসনব্যবস্থার প্রায় সব ক্ষেত্র ও পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র প্রভাব প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অনেক দিন ধরেই বলছে, দুদককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। কিন্তু তা হয়নি। ২৯ অক্টোবর দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলীয় রাজনৈতিক এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত দক্ষ ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানায়, যারা প্রকৃত অর্থেই স্বার্থ-দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে থেকে দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে দুদকের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যরে যথাযথ প্রয়োগ করে আইনের চোখে সব নাগরিক সমান এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কারও প্রতি ভয় বা করুণা না করে দায়িত্ব পালন, বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দুদক সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান নয়, এই ধারণা সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিকাঠামো শক্তিশালীকরণ, সংসদকে কার্যকর, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সততা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে সততা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা তখনই সম্ভব, যখন এই প্রতিষ্ঠান হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যরে যথাযথ প্রয়োগ করে আইনের চোখে সব নাগরিক সমান এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন, বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দুদক সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান নয়, এই ধারণা সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শক্তিশালী গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা তখনই সম্ভব, যখন এটি হবে পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত । না হলে শুধু আজ্ঞাবহ হলে, এর পরিণতি আমাদের ভোগ করতে হবে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সুতরাং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে শুধু ‘দুদক’ নয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক, ন্যায়সঙ্গত এবং সময়োপযোগী জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সব কাজ থমকে যাবে। তখন সাধারণ জনগণের কিছুই বলার থাকবে না। আর ‘জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা’ হবে কথার কথা।