বকেয়া বিল পরিশোধে বাংলাদেশকে চাপের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি আদানি গ্রুপ। অন্যদিকে কয়লা সংকটে পুরোপরি বন্ধ হয়ে গেছে মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। পাশাপাশি রামপাল, বড়পুকুরিয়া এবং এস আলমের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন হচ্ছে আংশিক। এ ছাড়া গ্যাসের অভাবেও বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিং হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী সোমবার আদানিকে একটা পেমেন্ট দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে কী পরিমাণ বিল দেওয়া হবে সেটি জানা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের গড় চাহিদা থাকে ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। তবে শীতে চাহিদা কমে ১০ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে চলে আসে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১১ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদার চেয়ে কিছুটা বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সারা দেশে ১ হাজার ৫৭৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত হয়েছে অন্তত ৬১৫ মেগাওয়াট। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত লোডশেডিং বাড়তে থাকে। অবশ্য ছুটির দিনে সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে।
জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদানির যে বকেয়া রয়েছে, তার একটা পেমেন্ট আগামী সোমবার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এস এস পাওয়ার প্ল্যান্টের (এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্র) বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আজ (গতকাল) রাতের মধ্যে সেটা হতে পারে। আশা করছি সোমবারের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। মাতারবাড়ী ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও যাতে দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারে সেই প্রচেষ্টা চলছে।’
গ্রাহককে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে পিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য আগামী গ্রীষ্মকালে যাতে লোডশেডিং না হয়। এ কারণে আগেভাগেই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
এদিকে একতরফা চুক্তির সুযোগ নিয়ে গত জুলাই থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার বাড়তি দাম ধরে বিদ্যুৎ বিল করার পাশাপাশি বকেয়ার জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে আদানি গ্রুপ। ইতিমধ্যে উৎপাদন কমিয়ে অর্ধেকের নিচে নামিয়েছে তারা।
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের গোড্ডায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত বছর উৎপাদন শুরুর আগেই কয়লার দাম ও চুক্তির শর্ত নিয়ে দেশ-বিদেশে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা।
একপর্যায়ে পিডিবির পক্ষ থেকে আদানিকে কয়লার চড়া দাম দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দাম কমাতে রাজি হয় আদানি। পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে কম দামে কয়লা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। তবে এক বছর পর এখন আবার ২২ শতাংশ বাড়তি দাম চাইছে তারা।
পিডিবি সূত্র মতে, পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতি টন কয়লার দাম নিচ্ছে ৭৫ মার্কিন ডলার। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস এস পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে টনপ্রতি কয়লার দাম ৮০ ডলারের কম। আর আদানি প্রতি টন কয়লার দাম চাইছে ৯৬ ডলার।
বাড়তি দাম নিয়ে বিরোধ ও বকেয়া পরিশোধের তাগিদের মধ্যে সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর পিডিবিকে চিঠি দেয় আদানি। এতে বলা হয়, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে পিডিবি বকেয়া পরিশোধ না করলে ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী ৩১ অক্টোবর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হবে।
পিডিবি সূত্র বলছে, কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানিতে আদানির নামে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কথা থাকলেও ডলার সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন পিডিবির পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ করে দিয়েছে আদানি। ৭৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার চালু ইউনিট থেকেও উৎপাদন হচ্ছে ৫০০ মেগাওয়াটের মতো।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, প্রতি সপ্তাহে আদানির বিল পাওনা হচ্ছে ২ কোটি ২০ লাখ থেকে আড়াই কোটি ডলার। এর বিপরীতে পিডিবি তাদের পরিশোধ করছে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের মতো। আগে পরিশোধের পরিমাণ আরও কম ছিল। এতে অক্টোবর পর্যন্ত তাদের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫ কোটি ডলার।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ এবং বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে পিডিবিকে বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে ডলার সংকট। এ কারণেই মূলত বকেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। তারা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে কম-বেশি করে বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে। আদানির পাশাপাশি অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোরও বকেয়া রয়েছে। এই বকেয়াগুলো পতিত সরকারের আমলের। কিন্তু আদানি এখন আগের চেয়ে বেশি চাপ দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা সরবরাহে ঠিকাদার নির্বাচনে কিছু জটিলতার কারণে কেন্দ্রটির কয়লা আমদানি বেশ কিছুদিন বন্ধের কারণে পুরো কয়লা শেষ হয়ে যায়। একপর্যায়ে গত ২৫ অক্টোবর পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির।
তবে ঠিকাদার নিয়ে জটিলতার অবসান হওয়ার পর গত সপ্তাহে কয়লা সরবরাহের জন্য চুক্তি হয়েছে। বিদেশ থেকে কয়লা আমদানির পর আগামী ২০-২৫ দিনের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু হবে বলে আশা করছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা।
অবশ্য কয়লা সংকটে বন্ধ হওয়ার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের যে কাজ, সেটি এখন চলছে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সহসা আর এই কেন্দ্র বন্ধ করা লাগবে না।
এদিকে বকেয়ার কারণে এস আলম গ্রুপের ১২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার বাশঁখালী এস এস পাওয়ার প্ল্যান্টেরও উৎপাদন কমানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল কেন্দ্রটি সরবরাহ করেছে ৪১৫ মেগাওয়াট। পিডিবির কাছে কেন্দ্রটির পাওনার পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকা। তবে এই কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পিডিবি।
এ ছাড়া কয়লা সংকটের কারণে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে করা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে ৬২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আসছে। আগামী ১০ নভেম্বরের পর দুটি ইউনিট চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে পিডিবির মালিকানাধীন ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গতকাল ৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা পাওনা দাঁড়িয়েছে পিডিবির কাছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রেখেছে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এমনকি গত ৩১ অক্টোবর থেকে কেন্দ্রটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ইউনিট কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর পিডিবির অনুরোধে তা পেছানো হয়েছে।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে ইউনিক মেঘনাঘাট ৫৮৪ মেগাওয়াট এবং সামিট মেঘনাঘাট-২ ৫৮৩ মেগাওয়াট দুটি কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি আরও বেশ কিছু কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে জ¦ালানি সংকটের কারণে।
আদানির বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা নেই : বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ও আদানি পাওয়ার লিমিটেডের মধ্যকার ইস্যুতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। এটি এশটি বেসরকারি সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যকার চুক্তি। বিষয়টি দুপক্ষের চুক্তির শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এই চুক্তিতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। সুতরাং এ বিষয়ে জানানোর জন্য এখন আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।