অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে ২০২২ সালের আগস্টে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একটি তদন্ত টিম তেজগাঁও মহিলা কলেজ পরিদর্শনে যায়। কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সেই পরিদর্শন টিমকে ঘুষ দেওয়ার নাম করে কলেজের ফান্ড থেকে তুলে নিয়েছেন ৩ লাখ টাকা। তার বিরুদ্ধে পাঁচ বছরে অনিয়মের মাধ্যমে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে মাসে ৩৩ হাজার টাকা ভাতা, গভর্নিং বডির মিটিংয়ের সম্মানীর নামে ৪৩ লাখ টাকা, বিজ্ঞাপন বাবদ ৭৪ লাখ ও গাড়ির খরচ বাবদ ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানোসহ কলেজ ফান্ডের লাখ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠেছে। শুধু আর্থিক এসব অনিয়মই নয়, অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম নিজের স্বার্থে অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তিনি শুধু তার কলেজপড়ুয়া মেয়েকে আনা-নেওয়ার জন্য এক নারীকে নিয়োগ দিয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে।
অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এমন বিস্তর সব অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মাউশিতে। উভয় সংস্থা এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও মহিলা কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং অর্থ আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ জমা দেন দুদকে। যাতে অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রসিদ ছাড়াই নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থগ্রহণ, অনার্সের ফরমফিলাপে অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা গ্রহণ, এক বিষয় ফরমফিলাপে ৬ হাজার গ্রহণ, ভর্তিতে বেআইনিভাবে ১৩ হাজার টাকা গ্রহণ, টিসি নিতে এক বছরের বেতনসহ অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং হোস্টেলের ভর্তি ফিশের নামে ৫ হাজার টাকা আদায়সহ বিভিন্ন খাতের অর্থ আত্মসাতের তথ্য তুলে ধরা হয়। কমিশন অভিযোগটি পাওয়ার পর তা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ-পূর্বক বিষয়টি অবহিত করতে গত ৯ অক্টোবর মাউশিতে চিঠি পাঠায়। দুদকের মহাপরিচালক মো. শাহরিয়াজ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, তেজগাঁও মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বেতন, পরীক্ষার ফিস, ফরম-ফিলাপ, ভর্তি ও হোস্টেলে ভর্তি ফিস আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয় দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট থেকে।
জানা গেছে, দুদকে অভিযোগ জমার আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর মাউশি অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সহযোগী কলেজের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম। তিনি বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের তেজগাঁও থানা কমিটির সভাপতি। কলেজের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হলে কলেজ ফান্ড থেকে তার ব্যয় বহন করা হয়। তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা লোপাট করেছেন। কলেজের যে গভর্নিং বডি রয়েছে, সেটি অলাভজনক কমিটি। অথচ এই কমিটি ও অন্যান্য উপকমিটির সভায় অংশ নেওয়া সদস্যদের সম্মানী দেওয়ার নামে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে, অর্থাৎ গেল ৫ বছরে ৪৩ লাখ ৩৩ হাজার ৯৩৬ টাকা ব্যয় দেখিয়ে কলেজের ফান্ড থেকে টাকা তুলে নিয়েছেন। এ ছাড়া বিজ্ঞাপনের জন্য ৭৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৭২ টাকা, গাড়ির জন্য ৪৫ লাখ ৮৩ হাজার ৯৮৩ টাকা এবং আপ্যায়নে ১১ লাখ ৬ হাজার ৫৭৮ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। ছাত্রীকল্যাণ খাতে ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে যথাক্রমে ১৩৩ টাকা ও ৩৫৬ টাকা খরচ দেখালেও পরের দুই বছর ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছাত্রীকল্যাণ খাতে ব্যয় দেখান ১২ লাখ ৮ হাজার ৩৬৭ টাকা। প্রতিবছর ৪২ থেকে ৪৬টি খাতে ব্যয় দেখানোর পরও বিবিধ খাতে খরচের নামে কলেজ ফান্ড থেকে ৬ লাখ ১১ হাজার ৮২৩ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
কলেজের বেতন বই পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নজরুল ইসলাম ২০১৮ সালের ১ জুলাই অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। তার বেতনস্কেল ৫০ হাজার ও ইনক্রিমেন্ট ১৯ হাজার ৮৯০ টাকাসহ মূল বেতন ৬৯ হাজার ৮৯০ টাকা। এর সঙ্গে তিনি বাড়ি ভাড়া বাবদ ৪২ হাজার ২২৮ টাকা, চিকিৎসা-ভাতা ১ হাজার ৫০০, নির্ধারিত ভাতা ৩৩ হাজার, প্রণোদনা ২ হাজার ৯২৮ ও ভবিষ্যৎ তহবিল ৫ হাজার টাকাসহ ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৪৬ টাকা উত্তোলন করেন।
অভিযোগে বলা হয়, বর্তমানে তেজগাঁও মহিলা কলেজে খণ্ডকালীনসহ ৭৫ জন শিক্ষক আছেন। সেখানে ১২টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে। নজরুল ইসলাম কলেজের অধ্যক্ষ হলেও তিনি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে প্রতি মাসে ভাতা নেন ৩৩ হাজার টাকা। প্রতিটি বিভাগের প্রধানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য ভাতা হিসেবে মাসে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে তিনি পছন্দের আরও ১০ জন শিক্ষককে ভাতা হিসেবে ১ থেকে ৭ হাজার টাকা করে দিচ্ছেন। তিনিসহ ২২ জন শিক্ষক ভাতা দিচ্ছেন। দেশে করোনা মহামারীর সময় কলেজের অন্য শিক্ষকদের ভাতা প্রদান বন্ধ রাখা হলেও অধ্যক্ষ ঠিকই ১৫ মাস ভাতা নিয়েছেন।
জানা গেছে, ২০২২ সালে তেজগাঁও মহিলা কলেজের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগের তদন্ত করতে মাউশির একটি টিম ওই বছরের আগস্টে কলেজ পরিদর্শনে যায়। ওই সময়ে তদন্ত টিমকে ঘুষ দেওয়ার কথা বলে কলেজের ফান্ড থেকে ৩ লাখ টাকা তুলে নেন অধ্যক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম শূন্যপদ দেখিয়ে নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের চারজনকে নিয়োগ দেন। তারা হলেন সিরাজুম মনিরা, ফাহিমা বেগম রাহী, নাদিয়া ও হিরা আক্তার। এ ছাড়া তিনি জেসমিন সুরাইয়া নামে একজনকে নিয়োগ দিয়েছেন, যার দায়িত্ব হচ্ছে হলিক্রস স্কুল ও কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া অধ্যক্ষের মেয়েকে আনা-নেওয়া করা। কামরুল ইসলাম নামে একজনকে নৈশপ্রহরী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাকে অফিস কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া তিনি কলেজ থেকে বেতন দিয়ে নিজের জন্য মিজান ও কিশোর নামে দুজন ড্রাইভার নিয়োগ দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি।