বকেয়া বিল না পেলে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশে ভারতের আদানি পাওয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেবে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদ্যুতের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার পর বকেয়া পরিশোধের বন্দোবস্ত করার জন্য চলতি মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত সময় দিয়েছে আদানি পাওয়ার। এ সময়সীমার মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে গতকাল রবিবার ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানিটির পক্ষ থেকে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করা হয়েছে। উল্টো চলতি সপ্তাহে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে দেশ রূপান্তরকে বলা হয়, ৭ নভেম্বরের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ডলার বকেয়া পরিশোধের কোনো আলটিমেটাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) দেয়নি তারা। বকেয়া আদায়ের জন্য পিডিবির সঙ্গে আলোচনা চলছে। দুপক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চায় আদানি পাওয়ার।
অবশ্য বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পিডিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বকেয়া পরিশোধ না করলে বিদ্যুৎ বন্ধের আলটিমেটাম দিয়ে আদানির পক্ষ থেকে একটা ইমেইল পাঠানো হয়েছিল।
আদানির কর্মকর্তারা জানান, কয়লা আমদানি নিয়ে এলসি (ঋণপত্র)-সংক্রান্ত জটিলতা ছিল। দুয়েক দিনের মধ্যে তা কেটে যাবে। তখন বন্ধ থাকা দ্বিতীয় ইউনিটও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এ সপ্তাহে যদি পিডিবি কিছু বিল দেয়, তাহলে পুরোদমে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে বলে আশা করছেন।
জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদানির যে বকেয়া রয়েছে তার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ১০ মিলিয়ন ডলার পেমেন্ট করা হয়েছে। আরও একটা পেমেন্ট আজ সোমবার (৪ নভেম্বর) দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের (এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্র) বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আশা করছি সোমবারের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। মাতারবাড়ী ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও যাতে দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারে, সেই প্রচেষ্টা চলছে।’
ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগেই কয়লার দাম ও চুক্তির শর্ত নিয়ে দেশ-বিদেশে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। একপর্যায়ে পিডিবির পক্ষ থেকে কয়লার চড়া দাম দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দাম কমাতে রাজি হয় আদানি। পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে কম দামে কয়লা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। এক বছর পর এখন আবার ২২ শতাংশ বাড়তি দাম চাইছে আদানি। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে আদানি বলছে, তারা কয়লার কোনো বাড়তি দাম চায়নি। বিষয়টি আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
পিডিবি সূত্রমতে, পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতি টন কয়লার দাম নিচ্ছে ৭৫ মার্কিন ডলার। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে টনপ্রতি কয়লার দাম ৮০ ডলারের কম। আর আদানি প্রতি টন কয়লার দাম চাইছে ৯৬ ডলার।
বাড়তি দাম নিয়ে বিরোধ ও বকেয়া পরিশোধের তাগিদের মধ্যে গত ২৮ অক্টোবর পিডিবিকে চিঠি দেয় আদানি। এতে বলা হয়, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে পিডিবি বকেয়া পরিশোধ না করলে ক্রয়চুক্তি মোতাবেক ৩১ অক্টোবর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হবে আদানি। কারণ, চলতি মূলধনের সংকটে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
পিডিবি সূত্র বলছে, কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানিতে আদানির নামে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কথা থাকলেও ডলার সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন পিডিবির পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার থেকে ১৪৯৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ করে দেয়। একপর্যায়ে দ্বিতীয় ইউনিট থেকেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে ৫০০ মেগাওয়াটের মতো পৌঁছায়। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে গড়ে প্রতিদিন ১৪০০ থেকে ১৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসছিল। সময়মতো বিল না পাওয়ায় প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানি করতে না পারার কারণেই এমন সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে আদানি।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, প্রতি সপ্তাহে আদানির বিল পাওনা হচ্ছে ২ কোটি ২০ লাখ থেকে আড়াই কোটি ডলার। এর বিপরীতে পিডিবি তাদের পরিশোধ করছে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের মতো। আগে পরিশোধের পরিমাণ আরও কম ছিল। এতে অক্টোবর পর্যন্ত তাদের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫ কোটি ডলার। অক্টোবরে বাংলাদেশ আদানিকে বিদ্যুতের বকেয়া বাবদ ৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার দিয়েছে, যা আগের তিন মাসের পরিশোধের চেয়ে বেশি। বর্তমানে বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৭৫ কোটি ডলার।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কারণে আদানি যদি সত্যি সত্যি বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়, তাহলে দেশে বিদ্যুতের বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যমে বিষয়টি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলা হচ্ছে আদানির বিদ্যুৎ বন্ধ হলে বাংলাদেশের বৃহৎ অংশ অন্ধকারে ডুববে। এসব ধারণা একেবারেই অমূলক। কারণ গরম কমে যাওয়ায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদাও কমে গেছে। ফলে লোডশেডিং কিছুটা বাড়লেও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই। প্রয়োজনে বিকল্প হিসেবে সাময়িক সময়ের জন্য তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে সরকার।
এদিকে কয়লা সংকটের কারণে এস আলম গ্রুপের ১২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় বর্তমানে কেন্দ্রটি থেকে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এলসি জটিলতার কারণে তারা সময়মতো কয়লা আমদানি করতে পারেননি। আজ সোমবার সেই জটিলতা কেটে যাবে। ইতিমধ্যে ৬০ হাজার ৫০০ টন কয়লা নিয়ে একটি জাহাজ দেশে এসে পৌঁছেছে। আজ তাদের পেমেন্ট দেওয়ার পর দ্বিতীয় ইউনিটটিও রাতের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হবে। তিনি আরও জানান, ৮ নভেম্বর আরও প্রায় ৫৫ হাজার টন কয়লা দেশে পৌঁছাবে। একইভাবে ১২ ও ১৬ তারিখেও একই পরিমাণ কয়লা আসবে। ফলে কয়লা নিয়ে আপাতত আর সংকট থাকবে না।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, মাতারবাড়ীতে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা সরবরাহে ঠিকাদার নির্বাচনে কিছু জটিলতায় কেন্দ্রটির কয়লা আমদানি বেশ কিছুদিন বন্ধের কারণে পুরো কয়লা শেষ হয়ে যায়। একপর্যায়ে গত ২৫ অক্টোবর পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় কেন্দ্রটিতে। তবে ঠিকাদার নিয়ে জটিলতার অবসান হওয়ার পর গত সপ্তাহে কয়লা সরবরাহের জন্য চুক্তি হয়েছে। কয়লা আমদানির পর আগামী ২০-২৫ দিনের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু হবে বলে আশা করছেন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। অবশ্য কয়লা সংকটে বন্ধ হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের যে কাজ, সেটি এখন চলছে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সহসা আর এ কেন্দ্র বন্ধ করা লাগবে না।
এ ছাড়া কয়লা সংকটের কারণে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগের ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল কেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে ৬২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আসছে। আগামী ১০ নভেম্বরের পর দুটি ইউনিট চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা পাওনা দাঁড়িয়েছে পিডিবির কাছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রেখেছে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি। এমনকি গত ৩১ অক্টোবর থেকে কেন্দ্রটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ইউনিট কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণার পর পিডিবির অনুরোধে তা পেছানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার অতিরিক্ত ও বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে পিডিবিকে বিপুল লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে ডলার সংকট। এ কারণেই মূলত বকেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। তারা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে কমবেশি করে বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে। আদানির পাশাপাশি অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রেও বকেয়া রয়েছে। এ বকেয়াগুলো পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের।
বাংলাদেশ কোনো বিদ্যুৎ সংস্থার কাছে জিম্মি হবে না
সমান্তরালে সংস্কার নির্বাচন
দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৪ তরুণের