আটায় অস্থিরতা কার দায়ে?

দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চাল। এরপরই রয়েছে আটা-ময়দা। ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) দোকানগুলোয় চাল-আটা বিক্রি বন্ধ হলে, দেশের লাখ লাখ দরিদ্র পরিবার অসহায় হয়ে পড়বে। ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে তারা বেছে নেবে ভিন্নরকম পথ। তখনই অবনতি হবে আইনশৃঙ্খলার। যেভাবেই হোক, এই শ্রেণিকে বাঁচতে হবে। যে কারণে এই পণ্যের সরবরাহ নিয়মিত রাখতে হবে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, প্যাকেটজাত আটায় কোম্পানিগুলো অস্বাভাবিক মুনাফা করছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, প্যাকেটজাত পণ্যে অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন ব্যবসায়ীরা। সংগঠনের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন,  কোম্পানিগুলো ইচ্ছেমতো আটা-ময়দা ও চালের দাম নির্ধারণ করছে। এটি রোধে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের রেষারেষিতে খোলাবাজারে (ওএমএস) আটা সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাহলে এই দায় কার? ফলে চালের ঊর্ধ্বমূল্যের সঙ্গে আটার দাম বেড়ে গেলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনধারণে ফের  সংকট হবে বলে মনে করছেন খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এদিকে সরকারের ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কার্যক্রম নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এ সংক্রান্ত নীতিমালায় অপ্রয়োজনীয় কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়ায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আটা সরবরাহকারীদের এক ধরনের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে অংশীজনদের মতামত না নেওয়া, মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের মতামত উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে। আবার একজন ভোক্তা দেরিতে আটা পান এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে গমের বরাদ্দ বাতিল করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। এ বিষয়ে  সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

জানা যাচ্ছে, ২০০০ সাল থেকেই ওএমএস কর্মসূচিতে আটা সরবরাহ করেন নারায়ণগঞ্জের মিলমালিকরা। ঢাকায় মিল ৬টি আর নারায়ণগঞ্জে ১৬টি। এ কারণে তাদের বরাদ্দও বেশি। সম্প্রতি সেই বরাদ্দে ভাগ বসানোর জন্য ঢাকার ব্যবসায়ীরা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। মো. মাহফুজ আহমেদ নামে একজন ভোক্তা গত ২৫ সেপ্টেম্বর খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তিনি সময়মতো খাদ্য অধিদপ্তরের ট্রাক থেকে আটা কিনতে পারেন না। ট্রাকগুলো সময়মতো নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয় না বলেও দাবি করেন। দিনমজুর মাহফুজ জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে আটা ঢাকায় আনার কারণে ওএমএসের ট্রাক সময়মতো নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতে পারে না। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে আটা কিনতে ব্যর্থ হলে তার উপার্জনের সময়ও থাকে না। এ কারণে তিনি নারায়ণগঞ্জের বাড়তি বরাদ্দ ঢাকার ব্যবসায়ীদের দেওয়ার দাবি জানান। অভিযোগ পাওয়ার পর খাদ্য মন্ত্রণালয় ঢাকা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুন আল মোর্শেদ চৌধুরীর কাছে প্রতিবেদন চায়। প্রতিবেদনে তিনি খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানান, অভিযোগকারীর অভিযোগ সঠিক নয়। ঢাকা জেলার মিলগুলোর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের মিলগুলোও ঢাকা জেলায় সঠিক সময়ে আটা সরবরাহ করছে। ডিলাররা এই আটা ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন। এ ছাড়া, ঢাকা জেলার মিলগুলোর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ জেলার মিলগুলোকে পেষণ ক্ষমতার আনুপাতিক হারে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা জেলার মিলগুলো থেকে আপত্তিমূলক কোনো পত্রও পাওয়া যায়নি। মাহফুজ আহমেদ বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে যান। আদালতের নির্দেশনার মেয়াদ পার হলেও স্বাভাবিক নিয়মে ফিরছে না খাদ্য অধিদপ্তর। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতি ও ফ্লাওয়ার মিলস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জসিম উদ্দিন মৃধা খাদ্য সচিবের কাছে এক আবেদনে জানিয়েছেন, চলমান ওএমএস কার্যক্রমকে ব্যাহত করার জন্য বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারীরা নানা উপায়ে কাজ করছে। এতে মন্ত্রণালয় মিলারদের সঙ্গে কথা না বলে নানা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাতে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ক্ষতির মুখে পড়বে। খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি রেষারেষির। সম্প্রতি ঢাকার কিছু নামি করপোরেট প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসায় নেমেছে। এতে নারায়ণগঞ্জের এসব ছোট ও পুরনো মিলের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। এ ছাড়া নীতিমালা নিয়েও কিছু জটিলতা রয়েছে। নীতিমালা অনেকবার সংশোধন করা হয়েছে। এসব সংশোধনীর সময় স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন হিসেবে মিলারদের ডাকা হয়নি। গত দুই বছরে খাদ্য মন্ত্রণালয় ওএমএসের আটা বিতরণ নীতিমালায় ১০ দফা পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু সাধারণ ভোক্তার তেমন কোনো উপকার হয়নি।

সরকার সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে চাল ও আটা বিক্রি করে। কিন্তু এটি নিয়েও যদি মুনাফাখোরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি কেবল জটিল নয়, রীতিমতো আতঙ্কজনক। এই সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য সঠিক নীতিমালা এবং তা মনিটরিং করে সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে।