যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘প্রগতিবাদী’ ডেমোক্র্যাট আর ‘রক্ষণশীল’ খ্যাত রিপাবলিকানদের দ্বৈরথের মধ্যে এমন অনেক প্রার্থী থাকেন, যারা কি না পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন না। ঠিক সে রকমই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস এবং রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পের লড়াইয়ের মধ্যেও একজন আলো কাড়ছেন অন্যভাবে। তিনি জিল স্টেইন। পেশায় চিকিৎসক এই রাজনীতিক মার্কিন রাজনীতিতে পরিবেশবাদী প্রগতিশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠী গ্রিন পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০১২ ও ২০১৬ সালেও তিনি প্রেসিডেন্ট পদে লড়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির দ্বিদলীয় বৃত্তের মধ্যে গ্রিন পার্টি দুনিয়ার সবচেয়ে প্রতাপশালী পুঁজিপতিদের দেশে অন্যরকম রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে প্রচার চালিয়ে থাকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা যুদ্ধ আর মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে স্টেইন প্রধানতম দুই দলের বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থানের কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে মনোযোগ কাড়ছেন। জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগে ভারাক্রান্ত তরুণদের আগ্রহ ৭৪ বছর বয়সী এই নারীকে ঘিরে। জলবায়ু সুবিচারের দাবি তার ভাষণের প্রাণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন মেরুর অবস্থানকে তিনি নিন্দা করেন। আর খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এজেন্ডাকে বিবেচনায় নিলে বলা যায়, সম্ভবত তিনি নির্বাচনী সভাগুলোতে সবচেয়ে জনবান্ধব কর্মসূচির কথা বলেছেন। তার ভাষণ ট্রাম্পের মতো লোকপ্রিয়তার ধার ধারে না। গর্ভপাত ও বর্ণবাদের মতো ইস্যুতে অতি রক্ষণশীলতাকে তিনি ক্ষুরধার ভাষায় আক্রমণ করেন। আবার কমলা হ্যারিসের মতো তিনি বাকসর্বস্ব উদার বাণীও শোনান না। উদার দৃষ্টিভঙ্গি সুরক্ষার প্রশ্নে তিনি দৃঢ়কণ্ঠ। মোটের ওপর তিনি যেমন ডেমোক্র্যাটদের উদার দৃষ্টিকোণের সংকটকে কাঠগড়ায় তুলেছেন; তেমনি রিপাবলিনকানদের চাঁছাছোলা ভাষায় বিঁধতেও ছাড়েননি। তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমারও কমতি নেই। বলাবাহুল্য, মার্কিন সমাজে তিনি ও তার দল যে আগের চেয়ে কিছুটা হলেও সুবিধাজনক জায়গা পাচ্ছে, তা অনস্বীকার্য। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ নির্বাচনে গ্রিন পার্টির প্রার্থী এক মিলিয়ন ভোট সংগ্রহ করেছিল। এবারও তারা দাগ কাটতে পারে।
জিল স্টেইন মার্ক্সবাদের অনুরাগী। তার মতো উদার-প্রগতিশীলরাই মূলত গ্রিন পার্টির ‘সবুজ মূল্যবোধ’ ধারণকারী। ‘নিউ গ্রিন ডিল’ প্রস্তাবনা তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার আধার, যেখানে জ্বালানি খাতকে নবায়নযোগ্য খাতে স্থানান্তরকরণ, কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-আবাসন খাতে ব্যাপকহারে জনবান্ধব করার অঙ্গীকার আছে। গ্রিন আন্দোলনকর্মীরা জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী মার্কিন অর্থনীতির অভিজাতদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেন। বামপন্থি মনোভাবাপন্ন যারা পুঁজিবাদকে পৃথিবী ধ্বংসের জন্য দায়ী করছেন, তাদের অনেকেই ভিড়ছেন সবুজ মূল্যবোধের প্লাটফর্মে। সারা পৃথিবীতে গত দুই দশকে জলবায়ু, পরিবেশ, প্রাণ-প্রকৃতি, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রভাব বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে যে প্রগতিশীল আন্দোলনকর্মীরা ধরিত্রী বাঁচাতে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনকে নতুন গতিমুখ দিয়েছে। সেই ধারাতে যুক্তরাষ্ট্রেও জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের উত্থান দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রগতি আর উদার মূল্যবোধের ফেরিওয়ালাদের ভোটের বাক্সে ভাগ বসাচ্ছে পরিবেশবাদী রাজনৈতিক কর্মীদের উত্থান।
জিল স্টেইনের রাজনৈতিক উত্থানের গল্পটা চমকপ্রদ। চিকিৎসক থাকাকালে লক্ষ করেন, ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের জনস্বাস্থ্যের অবস্থা নাজুক হচ্ছিল। সে সময় ম্যাসাচুসেটসের অর্ধশতাধিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিদারুণ সংকট তৈরি করে জনজীবনে। নব্বইয়ের দশকের বিভিন্ন সময়ে স্টেইন এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালান। এ সময় ডেমোক্র্যাট শিবিরের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, পরিবেশ, বাস্তুসংস্থান রক্ষায় প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান তার রাজনৈতিক ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ২০০২ সালে তিনি গ্রিন পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। নানা সময়ে আন্দোলন কর্মসূচির কারণে তাকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। স্টেইনের আপসহীন মনোভাব গ্রিন পার্টিকে একটি আদর্শিক ভিত্তি দিয়েছে। এবারের নির্বাচনেও তিনি সেই আদর্শটুকুকেই নিজের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
প্রতিবারই দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের ফল নির্ধারণে সুইং তথা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলো ভূমিকা রাখে। সেক্ষেত্রে গ্রিন পার্টি তথা স্টেইনের পক্ষে ভোটের হার বাড়ার অর্থ হলো, বাকি দুই শিবিরের ব্যবধানে তারা কোথাও কোথাও নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে। আর এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, নানা পরিসরে এই আলোচনা ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এবার বড় একটা প্রভাবক হবে আমেরিকান আরব জনগোষ্ঠীসহ এশীয় মুসলিমদের ভোট। গাজা যুদ্ধের কারণে তারা জো বাইডেনের প্রশাসনের ওপর এমনিতেই নাখোশ। এ অবস্থায় এসব ভোট রিপাবলিকানমুখী না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেটা হলে এসব ভোট পড়তে পারে গ্রিন পার্টির ঝুলিতে। ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিবাদী প্রতিশ্রুতিকে গ্রিন আন্দোলনকর্মীরা যেভাবে ‘প্রতারণাপূর্ণ’ বলে দাগিয়ে দেন, তাতে মুসলিম ভোটের একাংশ স্টেইনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। বিষয়টি, অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ইলেকটোরাল কলেজের হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে জয়-পরাজয়েরও নির্ধারক হতে পারে। একইভাবে ভোটারদের এই মনবদল আদর্শিক রূপান্তরও। গাজার রক্তাক্ত মানুষ, বিশেষত নারী-শিশুদের ছবিগুলো ভোটারদের হৃদয়কে টালমাটাল করবে। সংক্ষুব্ধ ডেমোক্র্যাট ভোটাররাও ইসরায়েলকে থামাতে না পারার দায় ঠেলে দিচ্ছেন বাইডেনের ওপর। সুতরাং, গ্রিন পার্টির ভোটের হিসাব মেলাতে হলে ডেমোক্র্যাট শিবিরের দিকে নজর দিতে হতে পারে। মোটাদাগে, এসব ব্যাপার-স্যাপার ভোটের মাঠে কাজ করলে তা কমলার পথকে কঠিন করবে। সেজন্য, অনেকে জিল স্টেইনকে ‘ভোট-কাটোয়া’ অপবাদ দিচ্ছেন, যার ভূমিকা নাকি শেষ অবধি রিপাবলিকান ট্রাম্পের পক্ষেই যাবে। এমনকি এই শঙ্কা মার্কিন সমাজ থেকে আছড়ে পড়েছে বাকি পশ্চিমা বিশ্বে। রিপাবলিকানদের রক্ষণশীল জয় ঠেকাতে পশ্চিমা বিশ্বের পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টি এই শঙ্কায় বীতশ্রদ্ধ। ফলে, ইউরোপীয় গ্রিন পার্টির সমন্বিত ফোরাম জিল স্টেইনকে আহ্বান জানিয়েছে, তিনি যেন কমলাকে সমর্থন করে লড়াই থেকে সরে দাঁড়ান।
এবারের নির্বাচনে সম্ভবত জিল স্টেইন আগের তুলনায় খানিকটা বেশিই মনোযোগ কেড়েছেন। কংগ্রেসম্যান-ওম্যান না থাকলেও নানা স্তরে গ্রিন পার্টির জনপ্রতিনিধি রয়েছেন ১৫০ জনের মতো। তবে এক সময় সংখ্যাটি ছিল দুই শতাধিক। নিন্দুকেরা বলতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ লাখের মতো প্রতিনিধিত্বশীল পদের বিপরীতে এই সংখ্যা নেহাত নগণ্য। আবার দলটি ফেডারেল স্তরেও গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। উল্টোদিকে, সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে পশ্চিমা গণতন্ত্রে গ্রিন পার্টিগুলো ক্রমশ শক্তিশালী জায়গা দখল করেছে। অনেক জায়গায় তারা বাম, মধ্য-বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে সরকারে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাদের প্রতিনিধিত্ব দেখা যায়। মূলত, জলবায়ু উদ্বেগ গ্রিন পার্টিগুলোর এই প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করেছে। সেদিক থেকে বিচার করলে বলতে হবে, পশ্চিমা সভ্যতার কেন্দ্রস্থল আমেরিকায় বরং গ্রিন পার্টি সেভাবে জায়গা করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই মনে করেন, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে গ্রিন সমর্থকদের জোটবদ্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু জিল স্টেইনের মতো নেত্রী, যিনি ইহুদি পরিবারে বেড়ে উঠেও গাজার দুঃসহ মানবিক সংকটে ক্ষুব্ধ, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে চলাফেরাকে আমলে নেন না। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে তিনি প্রবল সোচ্চার সামগ্রিকভবে, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মৈত্রীর বদলে তিনি গ্রিন আন্দোলনকর্মীদের স্বকীয় উত্থান চান।
তবে, যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন পার্টির উত্থান ততটা গতিশীল নয় বলেই মনে করেন অনেকে। তাদের ভোট বাড়ার গতিও শ্লথ। রাজনীতির ময়দানে গ্রিন পার্টির সক্রিয়তা পুরনো হলেও স্টেইনের প্লাটফর্ম নবীনই। স্টেইন যে দলীয় প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে লড়ছেন, সেটির উত্থান এই শতকের শুরুতে; সময়ের হিসাবে যা ততটাও দীর্ঘ নয়। ২০০২ সালে গ্রিন-রেইনবো পার্টির হয়ে তিনি ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে লড়েছিলেন। হেরে গিয়েছিলেন রিপাবলিকান নেতা মিট রমনির কাছে। সেই সময়েই পরিবেশবাদী সংস্থা, প্রগতিশীল গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের সমবেত করে ঐক্যবদ্ধ গ্রিন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। পরে ২০১০ সালেও একবার একই পদে লড়াই করে হেরে যান। তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে যখন তিনি লড়ছেন, সে মুহূর্তে তিনি এখন নজরকাড়া একজন যোদ্ধার মতো ভাবমূর্তি অর্জন করেছেন। দুই দশকের অল্প সময়ের মধ্যে ‘সবুজ মূল্যবোধ’-এর প্রতি তার আপসহীন নেতৃত্ব তাকে খ্যাতি-পরিচিতি এনে দিয়েছে। স্টেইনের লড়াকু মানসিকতার ওপর ভর করে সবুজ সমর্থকরা পরিবেশের এজেন্ডাকে মূলধারায় আনার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি ফিলিস্তিন সংকট এবং গাজা যুদ্ধের প্রশ্নে মার্কিন নীতির সমালোচনা করে স্টেইন নিজের স্বকীয়তা জানান দিয়ে আসছেন। যুদ্ধ অর্থনীতির বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়ানো ছাড়াও মার্কিন অর্থনীতির অভিজাত গোষ্ঠীর প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান করে গ্রিন পার্টি নির্বাচনী ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে স্টেইন ও তার দল বেশ প্রাধান্য বিস্তার করছে। তাদের অবস্থান তৃতীয় বা চতুর্থ।
ধ্রুপদী সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে গ্রিন আন্দোলনকর্মীদের মার্ক্সবাদী বীক্ষণ আলাদা। জিল স্টেইনের সংগঠন ওয়াল স্ট্রিট পুঁজির আস্ফালন যেমন অস্বীকার করে, একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন মডেলে রাষ্ট্রের কর্র্তৃত্বে সমাজতন্ত্রকেও (স্টেট সোশ্যালিজম) গ্রহণ করে না। তারা পুঁজির কর্র্তৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্র্তৃত্বকে সমানভাবে অগ্রাহ্য করে। অর্থনৈতিক অসমতা দূরীকরণ, সম্প্রদায়-অঞ্চলভিত্তিক যৌথ অর্থনীতি, বর্ণবাদবিরোধিতা, যুদ্ধবিরোধিতা ও আধিপত্যবাদী মানসিকতা রদ করার কথা বলা সবুজ নীতির সমর্থকরা নিজেদের পরিচয় দেন ‘ইকো সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে। গ্রিন পার্টির মধ্যে ফরাসি চিন্তক জ্যা-পিয়েরে প্রুধোঁর নৈরাজ্যবাদী দর্শনেরও প্রভাব আছে, যারা রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অনিবার্য মনে করে না।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
musfikur.muzahid1993@gmail.com