চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৫০ হাজার ব্যাটারি রিকশা

নিষিদ্ধ করলেও চট্টগ্রাম নগর জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অলিগলি ছেড়ে মূল সড়কে অনেকটা ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ চলছে অযান্ত্রিক এসব যানবাহন। 

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অযান্ত্রিক এসব যানবাহন যাত্রী এবং অন্যান্য গাড়ির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই গাড়ির যে কাঠামোতে তৈরি, এর সঙ্গে গতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে রাস্তায় হামেশা দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে নগর পুলিশ এসব রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে। কিন্তু তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। আর চালকরা বলছেন, পুলিশ শহরে যে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করেছে, তা তারা জানেন না। 

ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে অন্তত ৫০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করছে ট্রাফিক পুলিশ। ৫ আগস্টের আগে জব্দ করা ব্যাটারিচালিত রিকশা ৩ হাজার ৩৫০ টাকা জরিমানা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। এখন জব্দ করলে ২১ দিন পর ৭৫০ টাকা জরিমানা নিয়ে ছাড়া হয়। 
শাহ আলম নামে নামে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এক চালক বলেন, ৫ আগস্টের আগে ট্রাফিক পুলিশ ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করলেও কিছু টাকা ‘উপরি’ দিলে ছেড়ে দিত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এখন পুলিশ টাকা দাবি করে না। পথে পেলেই ‘টো’ (জব্দ) করে।

সুমন নামে আরেকজন চালক বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ব্যাটারিচালিত রিকশা ‘টো’ করলে ৩ হাজার ৩৫০ টাকা জরিমানা দিলেই ছেড়ে দিত ট্রাফিক পুলিশ। এখন ২১ দিন পর ৭৫০ টাকা জরিমানা দিয়ে আনতে হয়।

বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেলের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো অনুমোদন দেয়নি বিআরটিএ। ফলে এসব অবৈধ যানবাহন।’ 
এ ব্যাপারে নগরের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ হচ্ছে। তবু তাদের দৌরাত্ম্য থামছে না। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরও কঠোর হব আমরা।’ 

জানা গেছে, দিনে শহরের গলিপথগুলোতে এসব রিকশা চলাচল করে বেশি। আর সন্ধ্যা হলেই গলিপথ ছেড়ে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ায়। ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে বিভিন্ন সময় এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের দাবি উঠলেও তা বন্ধ হচ্ছে না। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। বিদ্যুৎ ঘাটতির সময়ে অবৈধ এই যানবাহন চলতে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত হচ্ছে না। এ ছাড়া এই বাহন নিরাপদও নয়। সাধারণ রিকশার অবকাঠামো কিছুটা পরিবর্তন করে তৈরি এসব রিকশা বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। এতে প্রায়ই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে।

নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চন্দ্রনগর এলাকার একটি গ্যারেজের ম্যানেজার আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। সরকার এসব রিকশা বন্ধ করে দিলে শহরে অর্ধ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে।’ 

রমিজ উদ্দিন, এয়াকুব, রফিকুল আলম নামে কয়েকজন চালক জানান, মানুষ এখন গতি চাইছেন। পায়ে টানা রিকশায় যেতে চাইছেন না। রোজগারে ভাটা পড়ছে। বাধ্য হয়ে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা ধার করে ব্যাটারি ও মোটর লাগাতে হয়েছে রিকশায়। এতে পায়ের কষ্ট হয় না, আবার ১৫-২০ কিলোমিটার বেগে যাওয়া যায়। তবে রিকশার শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশার উপকারিতাও অস্বীকার করছেন না অনেকেই। এক লহমায় শহরের গতি যেন বেড়ে গিয়েছে হঠাৎ। প্যাডেলচালিত রিকশা চালকদের একচেটিয়া জুলুমবাজিও কমেছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার নির্দিষ্ট কোনো রুট এবং স্ট্যান্ড না থাকায় যানজট সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। ব্যস্ততম মোড়গুলোয় ব্যাটারিচালিত রিকশা দাঁড়িয়ে যানজট তৈরি করছে।

চট্টগ্রাম কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী সাদমান সাদিদ বলেন, ‘কষ্টের চেয়েও আমার জীবন বড়। ব্যাটারিচালিত রিকশাচালককে যতই বলি আস্তে চালান, তিনি ততই জোরে চালান। বাসা থেকে যে পথ ধরে কলেজে যাই, সেই পথে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশাও চলে। তারা বেপরোয়া হয়ে বাসের সঙ্গেও পাল্লা দেন। প্যাডেলচালিত রিকশা বেশি চালু করে এটা বন্ধ করলে সমস্যা কী?’ 

যানজট সৃষ্টি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম শহর ব্যাটারিচালিত রিকশা সমিতির সদস্য দাবি করে চালক আবদুল জব্বার বলেন, ‘সড়কে এবড়োখেবড়ো হয়ে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। পথচারী হাঁটার পথে বসে হকার, যে যার মতো করে সড়কের জায়গা দখল করে পণ্য রাখে রাস্তায়। এসব কারণে সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরাই বা কী করব।’