বিদ্যুৎকেন্দ্রে জীবনঝুঁকি

আধুনিক জীবনযাপন যন্ত্র ছাড়া যেমন ভাবতে পারি না, তেমনি জ্বালানি ছাড়াও যান্ত্রিক সভ্যতা অসম্ভব। বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় আশি ভাগের বেশি জোগান দেয় ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি। বিশেষ করে পেট্রোলিয়াম তেল, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি। যে কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমরা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অন্যদিকে এই চরম নির্ভরশীলতাই ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। গোটা বিশ্ব জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যার পেছনে রয়েছে মূলত তিনটি কারণ অনিশ্চিত জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ এবং তেলভিত্তিক ভূরাজনীতি।

বিশ্বে প্রতিদিন বাড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ছে যানবাহন, শিল্প-কারখানা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বালানি চাহিদা। বিশ্ববাজারে দাম কম থাকায় ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে বিগত সরকার। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা ও ডলার সংকটে নাজুক আর্থিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যে কারণে এলএনজি আমদানি নিয়ে আরও চাপে পড়ে অর্থনীতি। ২০২০ সালের শুরু থেকে করোনাভাইরাস মহামারী ও ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে এলএনজির দাম প্রায় নাগালের বাইরে চলে যায়। তখনই নেওয়া হয়, সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি)। যা এখনো বহাল রয়েছে। যে কারণে নতুন এলএনজি প্রকল্প ও টার্মিনালগুলোর জন্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে। এ কারণে অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতি মুখে পড়বে এমন তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়। ‘বাংলাদেশের জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি প্রকল্পের ব্যয় ও একটি টেকসই ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়। দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বেসরকারি সংস্থা ধরা, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, মার্কেট ফোর্সেস এবং ফসিল ফ্রি চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে শনিবার ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশের স্বার্থে সব ধরনের প্রস্তাবিত এলএনজি বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং এলএনজি আমদানি অবকাঠামো পরিকল্পনা প্রত্যাহারের দাবি তোলা হয় অনুষ্ঠানে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের জন্য পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে এক-তৃতীয়াংশ অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম, ইউনিভার্সিটি অব লিচেস্টার এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন মিলিতভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। যে কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চাপে প্রস্তাবিত ৫০ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বারণ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এলএনজির ওপর ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিবর্তে বাংলাদেশ যদি ৬২ গিগাওয়াট (৬২ হাজার মেগাওয়াট) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তা হবে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার দ্বিগুণ।

বিগত সরকারের আমলে নেওয়া ওই এলএনজি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে অর্থনীতি ও পরিবেশে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ বিলিয়ন বা পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামে ৪১টি এলএনজি (গ্যাস) ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল বিগত সরকার, যা এখনো বাতিল হয়নি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণ হলে ওই এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবন ক্ষতির মুখে পড়বে। বাংলাদেশ বিদেশি মুদ্রা খরচের চাপে পড়বে। লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হবে। কিন্তু সেটা না করে বাংলাদেশ যদি স্বচ্ছ জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যায়, তাহলে জনজীবন রক্ষার পাশাপাশি অর্থের সাশ্রয় হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানিসংক্রান্ত কমিটি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কীভাবে দেশ জ্বালানি সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে, তা ভাবতে হবে গভীরভাবে। যারা জ্বালানি সংকট কাটানোর জন্য পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির কথা বলছেন, সেই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল জনবান্ধব সমাধান দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে। অবশ্য সরকারকেই এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হতে হবে।