ট্রাম্পের ‘ড্রিল বেবি ড্রিল’ তত্ত্ব ও জলবায়ু সম্মেলন

দেশে বিভিন্ন দুর্যোগের সময় একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়। সেটি হলো ত্রাণ চাই না, পরিত্রাণ চাই। অর্থাৎ ত্রাণ মুখ্য নয়, মানুষ দুর্যোগের কবল থেকে নিস্তার চায়। দুর্যোগের সময় ত্রাণ দিয়ে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু নিস্তার মেলে না। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সৃষ্ট দুর্যোগ নিয়ে পৃথিবীর মানুষ শঙ্কিত। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ জলবায়ুজনিত সমস্যার জন্য দায়ী। বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া প্রতিটি জলবায়ু সম্মেলনে কার্বন নির্গমন কমানো নিয়ে যতটা আলোচনা ও পর্যালোচনা হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে দেওয়া ক্ষতিপূরণ নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে উন্নত দেশগুলোর কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া কথা ছিল সবচেয়ে বেশি। মনে হয়েছিল, কার্বন নির্গমন কমানোর সিদ্ধান্ত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই মুখ্য বিষয় নয়, ক্ষতিপূরণ তথা ত্রাণ পাওয়াটাই মুখ্য বিষয়!

এখন পর্যন্ত ‘কপ-২৮’ পর্যন্ত অনেকগুলো জলবায়ু সম্মেলন হয়ে গেল কিন্তু কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যায়নি। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে থাকে এমন ছয়টি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ভারত। বিশ্বের মোট কার্বন নির্গমনের প্রায় ৫৮ ভাগ করে এই ছয়টি দেশ। আবার এ দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে অতটা মাথা ঘামায় না! কারণটা পরিষ্কার। যারা রীতিমতো পৃথিবী নামক ছোট্ট গ্রহটির ক্ষতি করছে তারা এটা নিয়ে মাখামাখি করতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। যত সমস্যা যেন সমুদ্র উপকূলবর্তী রাষ্ট্রগুলোর। উন্নত দেশসমূহ মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করে নিজেদের শিল্পের উৎপাদন বাড়িয়ে নিচ্ছে। দেশকে উন্নত থেকে আর উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এককথায়, এসব দেশ নিজ দেশের স্বার্থ ছাড়া অন্য দেশের ক্ষতিকে বিবেচনায় নেয় না।

কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাড়ছে জলবায়ুগত দুর্যোগের সংখ্যা। দেশে দেশে খরা, দাবানল, অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। বরফ গলে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বাড়ছে লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়। ক্ষতিপূরণ দিয়ে কি দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করা যায়? সমস্যা সৃষ্টি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেয়ে সমস্যা তৈরি না করাই দেশ ও জাতির জন্য শতভাগ মঙ্গলকর। উন্নত দেশগুলো কার্বন নির্গমন করে সমস্যা তৈরি করবে আর ভুক্তভোগী দেশগুলো ক্ষতিপূরণ চেয়েই যাবে এটা দীর্ঘকাল চলতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবী নামক গ্রহটিই হয়তো অচিরেই হারিয়ে যাবে। গত বছরের শেষে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ‘কপ-২৮’ সম্মেলনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হওয়াতে গতি সঞ্চার, ক্ষতিপূরণে কার্যকর অর্থায়ন, অভিযোজনে জোর ও সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি ইত্যাদি। ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ গঠনেরও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোন দেশ কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন কমাবে, দেশভিত্তিক কী পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার করবে সে ব্যাপারে আলোচনা ও প্রতিশ্রুতিই ছিল সার!

আইপিসিসি’র (ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) তথ্য মতে, এ শতাব্দীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা রক্ষা করা সম্ভব নাও হতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, পৃথিবী রক্ষার সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আইপিসিসি বলছে, ২০২৩ ছিল সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। তেল ও কয়লাভিত্তিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে পৃথিবীর তাপমাত্রা একটু একটু করে ক্রমবর্ধমানহারে বেড়েই চলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় বাজেটের একটা বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ধরিত্রী রক্ষায় এ মাসের ১১ তারিখ থেকে আজারবাইজানের বাকুতে শুরু হওয়া ‘কপ-২৯’ জলবায়ু সম্মেলনে চোখ বিশ্ববাসীর। চলবে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত। জলবায়ু সম্মেলনের ঠিক আগ মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই খবরে কপালে ভাঁজ পড়েছে জলবায়ু ও পরিবেশকর্মীদের। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা ট্রাম্প বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ‘প্যারিস চুক্তি’ থেকে নিজের দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এক ব্যয়বহুল ধাপ্পাবাজি।’ এবারও তিনি প্যারিস চুক্তি থেকে নিজের দেশকে প্রত্যাহার করে নেন কি না সেটা দেখার বিষয়! জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের বড় একটা অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার খবরে সময়মতো ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ‘ড্রিল বেবি ড্রিল’ তত্ত্ব ছড়িয়ে নির্বাচনী প্রচারে  ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানিতে বাড়তি লগ্নির কথা শুনিয়েছেন। তেল-গ্যাস উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছেন।

বিশ্বের একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি কার্বন নির্গমন করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। আবার সবচেয়ে বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশও যুক্তরাষ্ট্র। ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ও দূষণ কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ট্রাম্প আসায় সে লক্ষ্যমাত্রা আদতে পূরণ হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সাতটি কাজ শুরুতেই করবেন। তার একটি হচ্ছে জলবায়ু নীতিতে কাটছাঁট। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে জলবায়ু সম্মেলন শেষের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন (২০ জানুয়ারি) ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বকে টেকসই, নিরাপদ ও আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য সম্পদে বিশ্বব্যাপী ঐক্য ধরে রাখার বিকল্প নেই। ট্রাম্প এখন কোন পথে হাঁটবেন সেটাই দেখার বিষয়!

লেখক : জলবায়ু ও পরিবেশকর্মী

sadonsarker2005@gmail.com