আগামী ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো হোয়াইট হাউজের দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি। তার আগেই নিজের নতুন প্রশাসন ঢেলে সাজাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান প্রার্থীর নির্বাচনে জয়ের পর থেকে নতুন প্রশাসনে ইলন মাস্কের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছিল। সেই জল্পনাকে সত্যি করে আসন্ন রিপাবলিকান প্রশাসনে জায়গা করে নিয়েছেন শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক ও বিবেক রামাস্বামী। ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে নতুন বিভাগ ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি দায়িত্ব সামলাবেন দুজন। এদিকে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই অভিবাসীদের ওপর কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন এই রিপাবলিকান নেতা। তার দল ও প্রচার শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওভাল অফিসের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথম দিনেই কয়েকটি নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারেন ট্রাম্প। আর সেসব আদেশ হবে মূলত-অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ, সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ এবং বাইডেনের কিছু মানবিক কর্মসূচির কার্যক্রম বাতিল সংক্রান্ত। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত কয়েকটি সূত্রের বরাত এই তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইলন মাস্ক সরকারি কর্মকাণ্ডে দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করবেন সেটি আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। এবার অনেকটা অনুমিতভাবেই ট্রাম্প প্রশাসনে জায়গা করেন নেয়ায় ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’ নামে নতুন এই দপ্তরের কাজ কী হবে সেটি নিয়ে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। তবে দপ্তরটির কাজ কী হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কিংবা এ কাজে ইলন মাস্ক ও বিবেক রামাস্বামীর স্বার্থের সংঘাত দেখা দেবে কি না, সেসব নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। যদিও ট্রাম্প বলেছেন, সরকারের বাইরে থেকে উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দেবেন তারা। কিন্তু, এটিকে সরকারের গতানুগতিক কাঠামোর বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকারের বাইরে থেকে পরামর্শ এবং নির্দেশনা দেবে নতুন এই সরকারি দক্ষতা বিভাগ। ভোটের আগেই ইলন মাস্ক বলেছিলেন, নতুন গঠিত ‘সরকারি দক্ষতা বিভাগ’ কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটে দুই লাখ কোটি ডলার সাশ্রয়ের জন্য কাজ করবে। এই বিভাগকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মানহাটন প্রজেক্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ট্রাম্প।
মানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে আমেরিকার প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস নাগাদ এ দপ্তরের কাজ সমাপ্ত করার সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাস্ক ও রামাস্বামী। দুজনই একরকম হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন তাদের বক্তব্যে। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম এক্সের এক পোস্টে মাস্ক জানান, এটা সিস্টেমের মধ্যে একটা শকওয়েভ হিসেবে আবির্ভূত হবে। সেইসঙ্গে সরকারি অপচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কারও জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে। রামাস্বামী তার এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, আমরা কোনো ভদ্রতা দেখাতে যাব না।
প্রযুক্তি নির্ভর গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সর মালিক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তিনি। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে প্রায় ২০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছিলেন মাস্ক। ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিবেক রামাস্বামী প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা, অধিকারকর্মী ও বিনিয়োগকারী। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। পরে প্রাথমিক বাছাইয়ে হেরে রণে ভঙ্গ দেন। পরে ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান বিবেক।
এদিকে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথমেই অভিবাসী বিরোধী নির্বাহী আদেশ দিতে পারেন ট্রাম্প। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তার নির্বাহী এসব আদেশের ফলে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছাড়াই কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে মেক্সিকো সীমান্তে মার্কিন সেনার সংখ্যা বাড়ানো হবে এবং এই সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণেরকাজ আবার শুরু হবে। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুনরায় প্রেসিডেন্ট হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসীকে বের করে দেওয়া হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের প্রাথমিক নির্বাহী পদক্ষেপের তার অভিবাসন কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশটিতে ১ কোটি ১০ লাখ অভিবাসী বৈধতা পায়নি। নিউ ইয়র্ক, শিকাগো ও ডেনভারসহ কয়েকটি শহর অভিবাসীদের আশ্রয় ও সাহায্য দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
সম্প্রতি কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন প্রশাসনের মানবিক কর্মসূচির আওতায় লাখ লাখ অভিবাসীকে বৈধভাবে প্রবেশের যে অনুমতি দিয়েছিল, ট্রাম্প সেটিও বন্ধ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাইডেনের অস্থায়ী মানবিক ‘প্যারোল’ কর্মসূচির এসব অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা এবং ওয়ার্ক পারমিট নেওয়ার অনুমোদন পেয়ে আসছিল। এ ছাড়া বসবাসের নির্দিষ্ট সময় পেরোনোর পরেও যারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে, তাদের স্বেচ্ছায় চলে যেতে উৎসাহিতও করতে পারেন ট্রাম্প। কট্টর অভিবাসী বিরোধী হিসেবে পরিচিত টম হোমান এবং অন্যান্য রিপাবলিকানরা এক্ষেত্রে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। হোম্যান এরই মধ্যে নতুন ট্রাম্প প্রশাসনে সীমান্ত জার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির পরিচালক হিসেবে অভিবাসী নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন হোমান। ট্রাম্পের আরেকটি নির্বাহী আদেশে সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু হবে জানিয়ে দুই কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য তহবিল উন্মুক্ত করতে ট্রাম্প সীমান্তে ন্যাশনাল গার্ড সেনা পাঠাতে চান। অবৈধ অভিবাসনকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে চান তিনি।