নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল-সংক্রান্ত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে রুলের শুনানি পঞ্চম কার্যদিবসের মতো শেষ হয়েছে। গতকাল বুধবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চে এ শুনানি হয়। গতকাল শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি সংবিধানে থাকা ‘সমাজতন্ত্র’, ‘জাতির পিতা’, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বিলোপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এ ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা এবং এ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ ও সংবিধানের বুকে কুঠারাঘাত করা হয়েছে বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন।
২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। একই বছরের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতি এতে অনুমোদন দেন। এ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া এ সংশোধনীতে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করাসহ আরও কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে গত ১৯ আগস্ট রুল দেয় হাইকোর্ট। গত ৩০ অক্টোবর রুলের ওপর শুনানি শুরু হয়। এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ১৮ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান, সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদসহ পাঁচজনের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া জনস্বার্থে এ রিট আবেদনটি করেন। ইতিমধ্যে রিটকারীদের আইনজীবী শুনানি করেছেন। গত ২৯ অক্টোবর রুল সমর্থন করে আদালতকে সহায়তা করতে (ইন্টারভেনার) বিএনপির পক্ষে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আবেদন মঞ্জুর করে হাইকোর্ট। তার পক্ষে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন শুনানি করছেন। এ ছাড়া রুল সমর্থন করে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
গতকাল শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। কিন্তু সংবিধানে জাতির পিতা নিয়ে বিতর্ক আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৈরি সংবিধানে কিন্তু জাতির পিতা ছিল না। এটি পঞ্চদশ সংশোধনীতে যুক্ত করা হয়। এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। জাতির পিতা বলা মূল সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।’ সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদে থাকা ‘জাতি হিসেবে বাঙালি’ ও ‘নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি’ বাতিল চেয়ে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে ভাষা দিয়ে জাতিসত্তা নির্ধারণ করা হয় না। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা হয়েছে।’
শুনানিতে সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সংবিধানের মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র নয়। আমরা সমাজতন্ত্র বিলোপ চাই।’ শুনানিতে আগের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের যে বিধান ছিল, তা বহাল রাখার আরজি জানান রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা ৭ মার্চের ভাষণ ও মুজিবনগর সরকার-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংবিধানে থাকার যোগ্য না।
অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিতে আরও বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে, এ মাধ্যমে মৌলিক অধিকার ধ্বংস করা হয়েছে। এ সংশোধনী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান ও ২৪-এর বিপ্লবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ তিনি বলেন, ‘এ সংশোধনী পাসের আইনের মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এ সংশোধনী ও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ এবং সংবিধানের বুকে কুঠারাঘাত করা হয়েছে।’
শুনানি শেষে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে কেউ অস্বীকার করে না। ওনার অবদান অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি অনেক ওপরের মানুষ। কিন্তু একজন ব্যক্তি সব করেছেন এটি আমাদের সংবিধানের সঙ্গে যায় না। কেননা সংবিধানের বলা আছে, আমরা সবাই স্বাধীন করেছি। ওনারা (আওয়ামী লীগ) রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার জন্য করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তার কৃতিত্বকে ধ্বংস করার জন্য তারাই (আওয়ামী লীগ) দায়ী শুনানিতে এগুলো বলেছি।’