আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে নিজের প্রশাসন সাজাতে ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য কয়েকজনের নাম ঘোষণা করেছেন তিনি। তবে নির্বাচনে জয়ের পরই ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, এ প্রশাসনে তার আগের মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মাইক পম্পেওর জায়গা হবে না। এরপর থেকেই জল্পনা-কল্পনা চলছিল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন কে? দ্বিতীয় মেয়াদে নিজের প্রশাসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মার্কো রুবিওকে বেছে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক ও অ্যাটর্নি জেনারেলের নাম ঘোষণা করেছেন এ রিপাবলিকান। নতুন প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন তুলসী গ্যাবার্ড। আর অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিজের বিশ্বস্ত ও অনুগত ম্যাট গেটজকে বেছে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সিনেটর। ফ্লোরিডাতেই জন্ম রুবিওর। জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে লাতিনো বংশোদ্ভূত প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মার্কো রুবিও সম্পর্কে এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, মার্কো অনেক মর্যাদাপূর্ণ একজন নেতা। তিনি স্বাধীনতার জন্য অনেক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তিনি আমাদের জাতির জন্য একজন শক্তিশালী সহযোগী হবেন এবং আমাদের মিত্রদের জন্য একজন ভালো বন্ধু হবেন। রুবিও রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে শক্তি ব্যবহারের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অতীতে তিনি চীন, ইরান ও কিউবার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ক্ষেত্রে শক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে নিজের অবস্থান অনেকটা নমনীয় করে তোলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে যাওয়া রুবিও। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, নতুন এই দায়িত্ব নিতে মুখিয়ে আছেন। তার ওপর আস্থা রাখার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এই রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য।
তবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর রুবিওকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। কারণ, ২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন, সে সময়ের চেয়ে বর্তমান বিশ্ব আরও বেশি অস্থির এবং বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে চীন। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার জন্য যে ৯৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পাস হয়েছে, তার বিরোধিতাকারী ১৫ রিপাবলিকান সিনেটরের একজন ছিলেন রুবিও।
হাওয়াইয়ের সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য এবং কট্টর ট্রাম্প সমর্থক তুলসী গ্যাবার্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরবর্তী প্রধান হিসেবে বেছে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তুলসী যুক্তরাষ্ট্রের সেনা রিজার্ভের লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইরাক ও কুয়েতে সামরিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। মস্কোর প্রতি সহানুভূতিশীল যুদ্ধবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত তুলসী। তবে গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়ে গভীর অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে তুলসীকে বেছে নেওয়ার ঘটনা চমকের সৃষ্টি করেছে। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে তিনি ১৮টি গুপ্তচর সংস্থার নেতৃত্ব দেবেন এবং ৭৬ বিলিয়ন ডলারের বাজেট তদারকি করবেন। তুলসী গ্যাবার্ডকে মনোনয়নের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে তুলসী আমাদের দেশের এবং সব আমেরিকানের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। একজন সাবেক ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তিনি উভয় দলেই ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন। এখন তিনি গর্বিত রিপাবলিকান।
আমেরিকান সামোয়ায় জন্মগ্রহণ করা ৪৩ বছর বয়সী তুলসী গ্যাবার্ড হাওয়াইয়ের চারবারের কংগ্রেস সদস্য। ডেমোক্র্যাটদের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন তিনি। পরে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়ে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে সমর্থন দেন তুলসী। তবে ২০২২ সালে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টি ত্যাগ করে রিপাবলিকান শিবিরে যোগ দেন। সদ্য সমাপ্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে দেখা গেছে তাকে। গ্যাবার্ডের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তবে তিনি ২১ বছর বয়স থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি তখন হাওয়াই হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ৪২তম জেলা থেকে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিজের বিশ্বস্ত ও অনুগত ম্যাট গেটজকে বেছে নিয়েছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় গত বুধবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। ৪২ বছর বয়সী ম্যাট গেটজ ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য। এর ফলে তিনি দেশের শীর্ষ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময় আইনজীবী এবং হাউজ জুডিশিয়ারি কমিটির সদস্য হিসেবে গেটজের অতীত ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন সাবেক এ প্রেসিডেন্ট। অ্যাটর্নি জেনারেল পদে গেটজের এ মনোনয়ন তার এজেন্ডার অংশ বলে ইঙ্গিতও দিয়েছেন ট্রাম্প। দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে অস্ত্রীকরণ করার জন্য অভিযোগ তুলে আসছেন তিনি। ট্রাম্প তার বিবৃতিতে লিখেছেন, আমাদের বিচার ব্যবস্থার পক্ষপাতমূলক অস্ত্রায়নের অবসান ঘটাবেন গেটজ। আমাদের সীমান্ত রক্ষা করবে, অপরাধমূলক সংগঠনগুলোকে ভেঙে দেবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি নাগরিকদের নেতিবাচক মনোভাব দূর করবেন। ট্রাম্পের অনুগত বলে পরিচিত ম্যাট গেটজ সোশ্যাল মিডিয়ায় তার মনোনয়নকে বেশ ভালোভাবেই উদযাপন করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কাজ করা সম্মানের বলেও অভিহিত করেছেন তিনি।