বিনিয়োগ ছাড়াই লাভ ৪০ কোটি

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) জ্বালানি তেল পরিবহনে কোনো ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই শুধু ব্যবস্থাপনা করেই বছরে লাভ করবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। অগ্নিকান্ডে বিএসসির দুই জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল নিয়ে আনলোডিংয়ের কাজ করছে প্রাইভেট কোম্পানির ছয় জাহাজ। আর দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানি এ কাজ করায় মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে বিএসসির বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা লাভ হবে বলে জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক। এ বিষয়ে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্ল্যাগ প্রটেকশনের আওতায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) পরিবহন করবে। এর আওতায় আমরা মাদার ভেসেলের মাধ্যমে দুবাই ও সৌদি আরব থেকে ক্রুড অয়েল আনি। সেই ক্রুড অয়েলবাহী মাদার ভেসেল কুতুবদিয়ায় নোঙর করার পর সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আনা হয়।’

মাহমুদুল মালেক জানান, এতদিন এই লাইটারিংয়ের কাজ করত বিএসসির নিজস্ব জাহাজ বাংলার জ্যোতি ও বাংলার সৌরভ। ৩৭ বছরের পুরনো হলেও এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন আইন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে এ দুই জাহাজ চলাচলের অনুপযোগী ছিল। কিন্তু সরকারের বিশেষ অনুমোদনে তা চলাচল করছিল। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ‘বাংলার জ্যোতি’ ডলফিন জেটিতে তেল খালাসরত অবস্থায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ৪ অক্টোবর ‘বাংলার সৌরভ’ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা অবস্থায় অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর পরপরই উভয় জাহাজকে তেল পরিবহন থেকে সরিয়ে নেয় বিএসসি। বর্তমানে প্রাইভেট কোম্পানির জাহাজ দিয়ে তেল পরিবহনের কাজটি করা হচ্ছে।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘এখানে লাভের চেয়ে বড় বিষয় হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। আমরা শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন করতে পারছি। আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি, তারা তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জাহাজ এনে তেল পরিবহন করছে। আমরা তা মনিটরিং করছি। এ পদ্ধতিতে আমাদের বছরে ৩৫-৪০ কোটি টাকা লাভ হবে।’

তবে এ লাভের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তেল সেক্টরের একাধিক কর্মকর্তা যুক্তি দেখান, বিএসসির জাহাজ দুটির পেছনে আগে বছরে মেইনটেনেন্স খরচ হতো প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৪০ জন নাবিকের বেতন-ভাতা, জ্বালানি তেল ও নানাবিধ খাতে টাকা খরচ হতো। কিন্তু এখন তেল পরিবহনের কাজটি প্রাইভেট কোম্পানিকে দিয়ে দেওয়ায় এসব খাতে আর খরচ হবে না। বিএসসি বিপিসি থেকে চুক্তি অনুযায়ী যে টাকা পাবে সে হিসেবে নিজের লভ্যাংশ রেখে প্রাইভেট কোম্পানিকে ভাড়া দেবে। আর এতেই লাভবান হবে বিএসসি।

৬ জাহাজে পরিবাহিত হচ্ছে তেল : এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তেল পরিবহনের কাজটি করছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এ বিষয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (অয়েল অ্যান্ড গ্যাস) জহিরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির ছয়টি নিজস্ব জাহাজ রয়েছে, যেগুলো দিয়ে আমরা আমাদের ক্রুড অয়েল পরিবহন করতাম। বিএসসির দুর্ঘটনার পর আমরা সরকারকে সাপোর্ট দিতে এগিয়ে এসেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের জাহাজগুলো ৪ হাজার ২০০ টন তেল পরিবহন করতে পারে। সে হিসেবে একটি মাদার ভেসেল থেকে প্রায় এক লাখ টন খালাস করতে ২৫টি ভয়েস করতে হয়। আমাদের ছয়টি জাহাজ তেল পরিবহনের মাধ্যমে ১০ দিনের মধ্যে আমরা সব তেল খালাস করতে পারছি।’ বিএসসির দুই জাহাজ প্রতিটি এক ভয়েসে প্রায় ১২ হাজার টন তেল পরিবহন করত।’এখন এসব জাহাজ তেল পরিবহনের জন্য নিরাপদ কি না, শঙ্কা জানিয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে হয়তো বসুন্ধরার অয়েল ট্যাংকারগুলো সাপোর্ট দিচ্ছে। কিন্তু বর্ষাকালে সাগর উত্তাল থাকলে এগুলো সক্ষম কি না, তা চেক করতে হবে।’ বিপিসি মাদার ভেসেল থেকে তেল পরিবহনের জন্য এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুড়িং) চালু করেছিল মহেশখালীতে। কিন্তু তা এখনো পুরোপুরি সচল না হওয়ায় লাইটারিংয়ের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আনতে হচ্ছে। মহেশখালী সমুদ্র উপকূল থেকে সাগরের দিকে ১৬ কিলোমিটার দূরে একটি পয়েন্টে গোলাকার একটি রিং বসানো হয়েছে। সেই রিং থেকে সাগরের নিচে দিয়ে দুটি পাইপলাইন এসেছে মহেশখালীর কালামার ছড়া এলাকার স্টোরেজে। সেই স্টোরেজ থেকে সাগরের উপকূল ঘেঁষে মাটির নিচ দিয়ে পাইপলাইনে তেল আসার কথা পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। এই পাইপলাইনে তেল পরিবহনের জন্য গত বছর ৩ জুলাই ‘এমটি হোরে’ নামের জাহাজ প্রথম নোঙর করা হয়েছিল।