এবারের ফর্মুলা ‘প্লাস টু’

অনেকের ‘মাইনাস টু’ থিয়োরির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। যারা ভুলে গেছেন তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। এই তারিখটাকে ‘ওয়ান ইলেভেন’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে যে সন্ত্রাসী হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়েছিল তার নাম হয়েছিল ‘নাইন ইলেভেন।’ কারণ হামলাটা হয়েছিল সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখে। সালটা ছিল ২০০১। আমেরিকায় তারিখ লিখতে মাস আগে দিন পরে দেওয়াটাই রীতি। তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেক সময় তারিখ দিয়ে সেটার উল্লেখ করে। আমাদের দেশে অবশ্য আগে দিন পরে মাস দিয়ে তারিখ লেখা হয়। তবে, নাইন ইলেভেনের আদলে এখানেও ‘ওয়ান ইলেভেন’ বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে ছদ্মবেশী সেনাশাসন জারির দিনটির নামকরণ করা হয়েছিল। ওই দিন সশস্ত্র বাহিনীগুলোর প্রধানরা তাদের গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় বঙ্গভবন দখলে নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করান এবং একটি শিখণ্ডী সরকার গঠনে বাধ্য করেন। ওই সরকার কিছু লক্ষ্য ও কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছিল। তাদের একটা থিয়োরি ছিল, দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পারিবারিক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। দুই দলের শীর্ষে যে দুজন মহিলা আছেন তাদের সপরিবারে রাজনীতি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। এই থিয়োরি বা ফর্মুলার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মাইনাস টু’।

সেই ওয়ান-ইলেভেন বা মাইনাস টু হুট করে আসেনি। নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আসে তাতে নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নতুন এ বাস্তবতার আলোকে ইউরোপ-আমেরিকা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশে বড় দুটি দলকে বাদ দিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পরিকল্পনা করা হয়। এর জন্য অনেক আগে থেকে কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা চলছিল। পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে দুই ‘ব্যাটলিং বেগম’-এর মধ্যকার অসুস্থ দ্বন্দ্ব হিসেবে চিত্রিত করে। এই দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতিপ্রবণ রাজনীতি দেশের সমৃদ্ধির পথে প্রধান বাধা বলে অনেকদিন ধরে প্রচার চলতে থাকে। তারপর লগি-বৈঠার রক্তাক্ত তাণ্ডবকে ওয়ান ইলেভেন বা ছদ্মবেশী সামরিক শাসন জারির অজুহাত হিসেবে কাজে লাগানো হয়।

অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ পরিকল্পিত ও ছককাটা পথ ধরে চলেনি বলে ওয়ান ইলেভেন ও মাইনাস টু ফর্মুলা সফল হয়নি। দুবছরের মাথায় একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন করে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে ওয়ান ইলেভেনের রূপকারদের ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে চলে যেতে হয়। এরপর হাসিনা ক্ষমতায় বসে কী কী করেছেন এবং অবশেষে পাশ্চাত্যের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে কীভাবে রুষ্ট করেছেন তা এক দীর্ঘ উপাখ্যান। অভ্যন্তরীণভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে কুক্ষিগত করে তাদের তিনি সব প্রতিদ্বন্দ্বী ও জনগণের বিরুদ্ধে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর মতো ব্যবহার করেছেন। গণতন্ত্রকে নির্বাসিত ও নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছেন। হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, দখলদারি, দলীয়করণ, বিচারের নামে অবিচার, দুর্নীতি-লুণ্ঠন অপপ্রচার ও চক্রান্তকেই তিনি ক্ষমতা দখলে রাখার কৌশল বলে গ্রহণ করেছিলেন। আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একমাত্র ভারতকে তিনি তার ‘মেন্টর’ বলে মেনেছেন। কিন্তু শেষ অবধি সেনাশক্তি তার অন্যায় আদেশ মানতে অস্বীকার করলে অনুগত গোষ্ঠীগুলো বা ভারত কেউ তার ক্ষমতা রক্ষা করতে পারেনি। ক্রমাগত নির্যাতিত হতে হতে চরম ক্রোধে বেপরোয়া হয়ে ওঠা ছাত্র-জনতার তাড়া খেয়ে তাকে ভারতে পালাতে হয়। ছাত্র-জনতা দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব দেয় এবং তার নেতৃত্বে এক অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের এক নতুন পর্ব শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তি, গণতন্ত্র কায়েম ও ভোটাধিকার রক্ষায় এর আগেও অনেক বারই সফল আন্দোলন হয়েছে। ১৯৯০ সালেও সেনাবাহিনীর পক্ষত্যাগে ছাত্রগণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। এরশাদ পতনের পর মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছিল ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। এরপর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর মিলিত নৈরাজ্যকর ও বিধ্বংসী আন্দোলনে নতি স্বীকার করে বিএনপি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পরপর দুটি নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকার গড়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ভিত্তি ছিল সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনুমোদন। দুটি নির্বাচনের পর নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এ সমঝোতা ভেঙে পড়ে। আবার ঘটে আন্দোলনের নামে লগি-বৈঠার রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব। সেই পৈশাচিকতাকে অজুহাত করে ওয়ান-ইলেভেন ঘটে এবং অবশেষে দু’বছর পিছিয়ে দেওয়া নির্বাচনে শেখ হাসিনা ক্ষমতা করায়ত্ত করেন। হাসিনা ক্ষমতা হাতে পেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এক নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী শাসন চালান। ‘চব্বিশের ছাত্রগণ-অভ্যুত্থান’ সেই নিষ্ঠুর রেজিমের পতন ঘটায়।

সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে কেবল একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনই স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বৈরশাসনের পুনরুত্থান রোধের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। আমাদের রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া, এই রাষ্ট্রের কাঠামো ও বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যেই ‘উইনার-টেক-অল’ সিস্টেমের বীজ নিহিত আছে। এই সিস্টেমই সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার কায়েমের পথে এগিয়ে দেয়। লোভাতুর হাতে এই ক্ষমতা পড়লে সেই হাত দ্রুতই ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে। তাই কেবল একটি সুষ্ঠু নির্বাচন বা একদিনের গণতন্ত্র নয়, রাষ্ট্রকাঠামো ও সংবিধান সংস্কার ছাড়া গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার আসবে না। অন্তর্বর্তী সরকার এই বিশ্বাসই ধারণ করে এবং তারা নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রীয় কিছু প্রতিষ্ঠান, ক্ষেত্র ও সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়াও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো থেকে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের অপসারণ ও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন, আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং পতিত ফ্যাসিবাদের হোতাদের বিচারে সোপর্দ করতে হবে। এরজন্য কিছুটা সময় লাগবে এবং এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা ও সম্মতির প্রয়োজন হবে।

এই দীর্ঘসূত্রতা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে খানিকটা অধীর ও সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছে। এতে সমঝোতা ও সম্মতি খানিকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তারা সংস্কারের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, সংস্কার করার অধিকার কেবল নির্বাচিত সরকারের। বর্তমান সরকারের প্রধান কাজ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা। এর জন্য যেটুকু রদবদল অপরিহার্য কেবল সেটুকু তারা করতে পারে। তাতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। বিএনপির এ কথায় যুক্তি আছে। আবার এর পালটা যুক্তিও আছে। রাষ্ট্রকাঠামো ও সংবিধানের যে সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তা জাতীয় সমঝোতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে করতে হবে। কোনো নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের হাতে দায়িত্ব দিলে সে সমঝোতা ও ঐকমত্যে পৌঁছা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আওতায়ই এই সংস্কারকাজ সমাধা করা উচিত।

সংস্কারের প্রশ্নে সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই টানাপড়েন চলাকালেই এই সরকারের একশ দিন পূর্ণ হলো। শত দিবস পূর্তির ক্ষণে এই নিবন্ধটি লিখতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে, অচিরেই সংস্কারের চেয়ে নির্বাচনই বেশি জরুরি হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের আগামী দিনগুলোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের মনোভাবের কারণে নির্বাচনই বেশি অগ্রাধিকার পাবে বলে আমার ধারণা। ইউরোপ-আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের কল্যাণের চেয়ে তাদের স্বার্থই অগ্রগণ্য। আমি যে আভাস পাচ্ছি তাতে পশ্চিমারা তাদের স্বার্থেই এখন অতীতের মাইনাস টু ফর্মুলার বিপরীতে প্লাস টু ফর্মুলা বেছে নিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বিএনপির প্রতি নাক সিটকানো বাদ দিয়ে তারা চাচ্ছে এই দল যেন নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পায়।

ইউরোপ-আমেরিকা খুব বেশি সংস্কার, খুব বিলম্বিত নির্বাচন এবং উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে খুব বেশি দুর্বল করার পক্ষপাতী নয়। বেয়াড়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইউরোপ-আমেরিকার প্রতি অনেকটাই মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে। এই দুর্বল আওয়ামী লীগকেই ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড প্লাস করে রাখতে চায়। এদের দিয়েই তারা ইসলামপন্থিদের উত্থান রোধ এবং বিএনপির ওপর চাপ বজায় রাখার কাজ সারতে চায়। ড. ইউনূস ইউএনডিপি ও পাশ্চাত্যের কাছে সংস্কারকাজে যে বাজেট সহায়তা চেয়েছেন তারা তার পরিমাণ এতটা সীমিত রাখবে যাতে এ প্রক্রিয়া বেশি দূর আগাতে না পারে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কার্যব্যবস্থা যাতে খুব কঠোর না হতে পারে তার জন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সক্রিয় ও সোচ্চার রাখা হবে। আর নির্বাচন ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বারবার উচ্চারিত হতে থাকবে।

হাসিনার পতন ও পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় ওই দেশটির মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়েছে। তাদের কাছে এখন প্লাস টু-এর চেয়ে অনুকূল কোনো ফর্মুলাও নেই। তাই তারা এটা বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নেবে আর ভেতরে ভেতরে তুকতাক যা যা করার তা করতে থাকবে। দীর্ঘদিন তাচ্ছিল্য করার পর ইতিমধ্যে ভারত তাদের গরজেই বিএনপির সঙ্গে দুটি শর্তে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। শর্ত দুটি হচ্ছে : ক্ষমতায় গেলে বিএনপি বাংলাদেশের মাটিতে ভারত-বিরোধী কোনো কার্যকলাপ প্রশ্রয় দেবে না এবং হাসিনার আমলে সম্পাদিত সব দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বহাল রাখবে।

আমার ধারণা, নতুন এই প্লাস টু ফর্মুলার ব্যাপারে বিএনপি নেতৃত্বও কোনো না কোনো সিগন্যাল পেয়েছে এবং এতে তারা সম্মতও রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতি বিএনপি নেতাদের সহানুভূতিশীল ও অতি সহনশীল মন্তব্যের মধ্যে তারই আভাস পাওয়া যায়। তাহলে ব্যাপারটা কি এখানেই চূড়ান্ত? সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মাইনাস টু ফর্মুলার প্রতি ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারত সবারই সম্মতি ও অনুমোদন ছিল। তারপরেও সেটা ফেইল করেছে অভ্যন্তরীণ ডাইনামিক্সের কারণে। কাজেই ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্ক, জেনেভা, ব্রাসেলস, প্যারিস বা নয়াদিল্লি বসে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ফন্দি আঁটলেই যে তা বেঁধে দেওয়া পথ ধরেই চলতে থাকবে, এমন কোনো কথা নেই। অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাই সবচেয়ে বড় নিয়ামক। একগুচ্ছ তাজা ডিমে বাইরে থেকে তা দিতে থাকলে সেখান থেকে বাচ্চা ফুটতে পারে। কিন্তু পাথরকুচিতে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানো কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব

mrfshl@gmail.com