সংরক্ষিত আসন অকার্যকর

গণতন্ত্রের অন্যতম মূল শর্ত হচ্ছে সব ধরনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু পৃথিবীর বহু উন্নত দেশেও গত শতকের একটা সময় পর্যন্ত নারীদের ভোটাধিকারই ছিল না, সংসদে বা গণপ্রতিনিধিত্ব হওয়া দূরের কথা। নানা রকম আন্দোলন-সংগ্রাম আর লড়াইয়ের মাধ্যমে এইসব অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে পরিপূর্ণভাবে এইসব অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশ্ব জুড়েই রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় কম। ঐতিহাসিক পশ্চাৎপদতা ডিঙিয়ে নারীরা এখনো সমঅধিকার পায়নি। বাংলাদেশে অবশ্য নারীদের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়নি, এদেশে দীর্ঘদিন দুইজন নারী একাধিকবার করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জনপ্রিয় দুইটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবেও এই দুইজন আছেন লম্বা সময় ধরে।

তথাপি, সংসদে নারীদের অবস্থান খুবই কম। নারীদের সংখ্যা বাড়াতে ৩০০ আসনের নির্বাচিত সদস্যদের পাশাপাশি ৫০টি সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে, এই পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই সদস্যরা মূলত সরকারি দলের অলংকার হিসেবেই বিবেচিত, কার্যকরী ভূমিকা রাখার সুযোগও এদের সীমিত ছিল। আবার, যারা নারীদের সমঅধিকারের কথা চিন্তা করেন, তাদের মতে এই ধরনের সংরক্ষিত আসন বৈষম্যমূলক। আদতে মূলধারার রাজনীতিতে এই ধরনের কোটাব্যবস্থা নারীদের অগ্রগতিকে এক অর্থে বাধা দেয়। এমনটাই মনে করেন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, জাতীয় সংসদে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার প্রক্রিয়া তাদের জন্য অপমানজনক বলে মন্তব্য করেছেন জনাব মজুমদার। আমরা মনে করি নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নেও বিষয়টি আসলে অকার্যকর, এমনকি ক্ষতিকরও বলা যেতে পারে। যার নজির আমরা বিগত সংসদগুলোতে দেখে আসছি। তিনি আরও বলেছেন, ‘নারীদের আসন দিতে হবে ১০০টি। তবে তা হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক (সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত)। কেননা এখন টাকা দিয়ে নারীদের আসন কিনে নেওয়া হচ্ছে। ৪০০ আসন হলে ১০০টি নারীর জন্য বরাদ্দ করতে হবে, তাও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে। প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনাযোগ্য হলেও আমাদের ভাবতে হবে যে ১০০ আসনে নারী প্রতিনিধি পাওয়ার বাস্তবতা রয়েছে কি না। সেই সঙ্গে বাড়তি  আসন মিলিয়ে ৪০০ আসনে ভোট নিতে হলে অবকাঠামো ও খরচকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিটির অন্যতম হচ্ছে নির্বাচন সংস্কার কমিশন। কেবল নির্বাচন আয়োজন নয়, এই সরকারের উদ্দেশ্য এমন একটি সংস্কার করা, যাতে নির্বাচনী ব্যবস্থারই আমূল পরিবর্তন হয়, কোনো শাসক যাতে সংবিধানকে নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তন করতে না পারেন। কারণ, অতীতে বহুবার বাংলাদেশে শাসকদের ইচ্ছেমতো সংবিধান পরিবর্তিত হয়েছে এবং সেইসব পরিবর্তন জনআকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে গেছে। সংবিধানকে নানা সংশোধনীর মাধ্যমে নষ্ট করা হয়েছে উল্লেখ করে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, ‘বর্তমানে সংবিধানে বহু অসংগতি রয়েছে, যা পরিবর্তন করতে হবে।’ ওই একই আয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিপ্লব-উত্তর বাংলাদেশে যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা সংবিধান সংশোধনের কথা ভাবছি, সেটা তাদের (শহীদদের) প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা জানানো। কিন্তু আমাদের কিছু সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার বিষয় চিন্তায় রাখতে হবে।’ তবে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, ‘যে সংবিধান ফ্যাসিস্টদের জন্ম দিয়েছে, বিপ্লবের পর সেই সংবিধান গুরুত্ব হারিয়েছে।’

সংবিধান নিয়ে এদেশের ইতিহাসে অনেক ধরনের রাজনীতি হয়েছে। সংবিধানকে সামনে রেখে বিভিন্ন সময় সরকারে থাকা দলগুলো গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণ করেছে। অথচ, সংবিধান হচ্ছে জনগণের রক্ষাকবচ। জনগণের কল্যাণেই সংবিধান, উল্টোটা নয়। ফলে, জনগণের যাতে মঙ্গল হয়, সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত হয় সেইরূপ সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। নারীসহ সব প্রান্তিক মানুষকে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিতে হবে। আবার অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে জনগণ একটি নির্বাচনের জন্য অধীর হয়ে আছেন। ফলে সংস্কার বা সংশোধনের নামে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সঠিক হবে না, যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়।