রাষ্ট্র সংস্কার এগিয়ে নিতে প্রধান উপদেষ্টার অনুশাসন অনুযায়ী গণমাধ্যমসহ আরও পাঁচ সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্য কমিশনগুলো হলো স্বাস্থ্য, শ্রম, নারীবিষয়ক ও স্থানীয় সরকার। সংস্কার কমিশনগুলোতে একজন করে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখা হলেও শ্রম ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনে শিক্ষার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
গতকাল সোমবার ওই পাঁচ সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়টি জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। সেখান বলা হয়েছে, গণমাধ্যমকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও বস্তুনিষ্ঠ করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করার লক্ষ্যে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ গঠনের জন্য প্রধান উপদেষ্টার অনুশাসন রয়েছে। আর বিষয়টি জানিয়েছেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। প্রধান উপদেষ্টার অনুশাসন অনুযায়ী ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা যেতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ-সংক্রান্ত সারসক্ষেপে বলা হয়, কমিশন অবিলম্বে তাদের কাজ শুরু করবে এবং সংশ্লিষ্ট সব মতামত বিবেচনা করে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করবে।
কমিশনের প্রধান ও সদস্যরা সরকার নির্ধারিত সরকারি পদমর্যাদা, বেতন, সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তবে তাদের কেউ অবৈতনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাইলে বা সুযোগ-সুবিধা নিতে না চাইলে তা প্রধান উপদেষ্টা অনুমোদন করতে পারবেন। এই কমিশন প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যক্তিকে কমিশনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই কমিশনকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। কমিশনের কার্যালয় ও সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা ঠিক করবে অন্তর্বর্তী সরকার।
এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর সংস্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নির্বাচন, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন ও সংবিধান সংস্কারে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করার ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা। এসব কমিশন ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এরপর গত ১৭ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে আরও চারটি কমিশনের প্রধানের নাম ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। গতকাল পাঁচটি কমিশন পূর্ণাঙ্গ হওয়ায় কমিশনের মোট সংখ্যা দাঁড়াল ১১টিতে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদকে প্রধান করে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ গঠনের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
কমিশনের সদস্যদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধি শামসুল হক জাহিদ, নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সচিব আখতার হোসেন খান, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন ওনার্সের (অ্যাটকো) প্রতিনিধি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের ট্রাস্টি ফাহিম আহমেদ, মিডিয়া সাপোর্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক সাংবাদিক জিমি আমির, দ্য ডেইলি স্টারের বগুড়া প্রতিনিধি মোস্তফা সবুজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের উপসম্পাদক টিটু দত্ত গুপ্ত এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল মামুন।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন : স্বাস্থ্যসেবাকে জনমুখী, সহজলভ্য ও সর্বজনীন করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করার লক্ষ্যে ১২ সদস্যের স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রধান করা হয়েছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদকে।
কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকিস বিভাগের অধিদপ্তরের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাকির হোসেন, পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক লিয়াকত আলী, গাইনোকোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সায়েরা আক্তার, শিশু স্নায়ুতন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ডা. নায়লা জামান খান, সাবেক সচিব এম এম রেজা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল) অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক, আইসিডিডিআর’বির ডা. আজহারুল ইসলাম, স্কয়ার হাসপাতালের স্কয়ার ক্যানসার সেন্টারের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন, গ্রিন লাইফ সেন্টার ফর রিউম্যাটিক কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক, আইসিডিডিআর’বির শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য বিভাগের বিজ্ঞানী ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী উমায়ের আফিফ।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনে যারা : সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার অনুশাসন অনুযায়ী নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনের প্রধান হিসেবে আছেন নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হক। এই কমিশনের সদস্যরা হলেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাহীন সুলতান, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফৌজিয়া করিম ফিরোজ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার, নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হালিদা হানুম আক্তার, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা ফেরদৌসী সুলতানা এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিশিতা জামান।
শ্রম সংস্কার কমিশন যাদের নিয়ে : শ্রম অধিকার ও শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করার লক্ষ্যে গঠিত শ্রমিক অধিকারবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। এই কমিশনে সদস্য হিসেবে রয়েছেন সাবেক সচিব মাহফুজুল হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের অধ্যাপক জাকির হোসেন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, বাংলাদেশ লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এ কে এম নাসিম, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ম. কামরান টি রহমান, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি চৌধুরী আশিকুল আলম, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সাকিল আখতার চৌধুরী, শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।
স্থানীয় সংস্কার কমিশন : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদকে প্রধান করে আট সদস্যের ‘স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন’ গঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে এই কমিশন প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করবে।
কমিশনের সদস্যরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান, সাবেক সচিব এ এম এম নাসির উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুর রহমান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক মাহফুজ কবির, নারী উদ্যোগ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মাসুদা খাতুন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. তারিকুল ইসলাম এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।