উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সম্ভাব্য করণীয়

প্রায় আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষ মুদ্রাস্ফীতির দাবড়ানিতে নাকাল হচ্ছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন সীমিত আয়ের মানুষকে ভীষণ অরক্ষণীয় করে ফেলেছে। ২০২৪ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি পরিবার মাসিক আয়ের গড়পড়তা ৪২ শতাংশ খাদ্য খাতে ব্যয় করে। আর নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর এ খাতে ব্যয় আরও বেশি। এর অর্থ হলো মুদ্রাস্ফীতির অভিঘাতে এই শ্রেণির মানুষ আর্থিক, শারীরিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সহায়হীন বা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। বিগত অক্টোবরে মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০.৮৭ শতাংশ। কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২.৬৬ শতাংশ। আগের মাসে এই উভয় স্ফীতির হার কিছুটা কম ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করার পরও মুদ্রাস্ফীতি বাগে না আসায় অনেকেই দেশে এ নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বর্তমান পরিস্থিতির একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা প্রণিধানযোগ্য। তার ভাষ্য মতে, এটা ফলপ্রসূ করতে অন্ততপক্ষে দেড়-দুই বছর প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয়ত হলো সাম্প্রতিক বন্যা। এতে অনেক ফসল নষ্ট হয়। তিনি আরও বলেছেন, এখন আর তথ্য আগের মতো গোঁজামিল দিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে না; প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে বাস্তবতার আলোকে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তার বক্তব্যের সারবত্তা অস্বীকার করা যাবে না।

খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে এ দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে খাদ্যশস্যের মূল্যটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এই মুহূর্তে ভারতসহ বিশ্ববাজারে পর্যাপ্ত চালের মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশে আমন সংগ্রহের মৌসুমে চালের দাম ক্রমে বেড়েই চলেছে। এ জন্য খাদ্য বিভাগ খোলাবাজারে চাল ও আটা বিক্রি করছে। আসন্ন আমন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হয়ে খাদ্য অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চাল আমদানি শুরু করে দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে ৫ লাখ মে টন চাল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে মর্মে জানা গেছে। আবার বেসরকারি আমদানিকারকদের দিয়ে ৩.৮৭ লাখ টন চাল আমদানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দু-দুবার বন্যায় আমন ফসলের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সে ক্ষতির পরিমাণ ৮.৮৭ লাখ বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ। এ প্রেক্ষাপটে দেশে মূল্য কমাতে এ সময় চাল আমদানির উদ্যোগকে অনেকেই স্বাগত জানাবেন। কিন্তু এটা আসলেই একটি ব্যয়বহুল বিকল্প, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার এই সংকটকালে। 

খাদ্যশস্য বলতে প্রধানত তিনটি দানাদার শস্যকে বোঝানো হয় চাল, গম ও ভুট্টা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই তিনটি শস্যের মধ্যে চালের উৎপাদন সবচেয়ে কম এবং দাম সবচেয়ে বেশি। গমের উৎপাদন ও দর মধ্যম পর্যায়ের আর ভুট্টার উৎপাদন সবচেয়ে বেশি এবং দাম সবচেয়ে কম। এই শেষোক্ত শস্যটি পশুখাদ্য ও জৈব-জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। মানুষের খাদ্য হিসেবে এটি প্রথমোক্ত দুটি শস্যের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তবে মানুষের খাদ্য হিসেবে চাল ও গমের তুলনা খুবই প্রাসঙ্গিক; আর্থিক, প্রায়োগিক ও গুণাগুণের দিক থেকে এ তুলনা গুরুত্বপূর্ণও বটে। বিশ্বে চাল উৎপাদিত হয় প্রধানত এশিয়াতে; বার্ষিক পরিমাণ ৫২৫-৫৩০ মিলিয়ন মে. টন। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কেনাকাটা হয় মাত্র ৫০-৫৫ মিলিয়ন মে. টন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্য আমেরিকায় সামান্য কিছু চাল উৎপন্ন হলেও রপ্তানির বাজারে তেমন কোনো প্রভাব নেই। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫ শতাংশ ভাঙ্গা-দানাযুক্ত চালের দাম চলছে প্রতি মে. টন ৫১৫-৫৫০ (এফওবি) মার্কিন ডলার। ভারত ছাড়া অন্য কোনো উৎসে সাধারণত সিদ্ধ চাল পাওয়া যায় না। চাল বস্তাবন্দি অবস্থায় পরিবহন করতে হয়। ফলে জাহাজে পরিবহন ও খালাসকরণ বেশ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তা ছাড়া বাজার ছোট হওয়ায় সেখানে নতুন কোনো গ্রাহকের আনাগোনা দেখলে বিক্রেতারা রাতারাতি দাম বাড়িয়ে দেয়।  পক্ষান্তরে গমের উৎপাদন হয় সারা বিশ্বে। বছরে উৎপাদনের পরিমাণ ৭৯৫-৮০০ মিলিয়ন মে. টনের মতো। বিশ্ববাজারে বার্ষিক কেনাকাটার পরিমাণ ১৯০-২০০ মিলিয়ন মে. টনের মতো। আর দামও চালের চেয়ে অনেক কম। এই মুহূর্তে মাঝারি মানের গম (এইচআরডব্লিউ) প্রতি মে. টন ২২৫ থেকে ২৫৫ (এফওবি) মার্কিন ডলার। গম সাধারণত ঝুরা অবস্থায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়ে থাকে। ফলে পরিবহন ও খালাসে সময় এবং খরচ কম প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশেও বন্দরে সাইলো থাকায় গমের খালাস ও সংরক্ষণ অত্যন্ত সাশ্রয়ী।

এখন প্রশ্ন হলো, দেশে যদি খাদ্যশস্যের ঘাটতি থাকে এবং সেটা আমদানি করার প্রয়োজন হয়, তবে কোন শস্যটা আমদানি করতে হবে? ক্যালরির উৎস হিসেবে এ দুটি শস্য সমমানের। তবে গমে চালের চেয়ে আয়রন, তামা, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম বেশি রয়েছে। আবার চালের চেয়ে গমে ভোজ্য ফাইবারের পরিমাণ তিন গুণ বেশি। গমের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স চালের চেয়ে কম বিধায় এটা ডায়াবেটিসবান্ধব। তবে যারা গ্লুটেন সংবেদনশীল, তাদের জন্য গম কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে পারে মাত্র। কিন্তু এই শ্রেণির লোকজনের সংখ্যা খুব বেশি দেখা যায় না।  গম দামে কম, সরবরাহে সুলভ, খাদ্যশক্তিতে সমতুল্য হলেও অনুপুষ্টিতে চালের তুলনায় অধিক সমৃদ্ধ। দেশের মানুষ জেনে অথবা না জেনেই হোক, তারা কিন্তু এখন গম খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং দেশে গমের ভোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাকিস্তান আমলে গম প্রতিরোধে যেখানে মানুষ দাঙ্গা করেছে, সেই গমের ভোগ দেশে এখন ৭০ লাখ মে. টনের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এখন বছরে ১২ মিলিয়ন মে. টন গম আমদানি করে মিসর শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। বিশ্বের বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ চীনও এখন প্রায় একই পরিমাণ গম আমদানি করছে। দেশের উন্নয়ন, নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বর্ধন অব্যাহত থাকলে, বাংলাদেশ আগামী এক-দেড় দশকের মধ্যে গম ভোগে মিসরকে ছাড়িয়ে যাবে। সরকারের উচিত, খাদ্যশস্য ভোগের এই রূপান্তরে যতটা সম্ভব পৃষ্ঠপোষকতা দান করা। এই পটভূমিতে দেশের বর্তমান খাদ্য ঘাটতি (যদি থাকে) পূরণে গম আমদানি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।

রাজনৈতিক সরকারের অনেক ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকে। তারা জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কায় অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক টেকসই কর্মসূচি হাতে নিতে সাহসী হন না। কিন্তু এখন যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের তো সস্তা জনপ্রিয়তার দরকার নেই। বৃহত্তর জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক স্বস্তি তাদের প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। সর্বশেষ দরপত্রে চালের যে দর ($৪৭৭) পড়েছে, সেটা বন্দরে পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে দাম পড়বে ৫৭ টাকার বেশি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠাতে এর সঙ্গে আরও যোগ করতে হবে তিন-চার টাকা। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানের বেলায় চালের দর দেওয়া হয়েছে প্রতিকেজি ৪৭ টাকা। রাসায়নিক সার, শ্রমিকের মজুরি, সেচের জ্বালানি প্রভৃতি কৃষি উপকরণ বাবদ খরচ যেভাবে বেড়ে গেছে, তাতে বিনিয়োগের সুযোগ-খরচ বিবেচনায় না নিয়ে স্বেচ্ছাচারী কায়দায় নিরুদ্ধ ক্রয়মূল্যে নির্ধারণ করায় চাষির যেমন লাভ হবে না, তেমনি পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগেও আসবে না গতি। তখন অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে ভূমি ও বিনিয়োগ ক্রমে চলে যাবে অন্যত্র। এ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তখন আবার ৬০ টাকা কেজি দরে চাল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানি করতে হবে। রাজনীতির ভারমুক্ত ক্ষমতায় আসীন এ সরকারের অর্থনীতিবিদদের এটা ভালোই বোঝার কথা। এর মানে এই নয় যে, দেশে আদৌ চাল আমদানি করা হবে না। ঘাটতি থাকলে অবশ্যই আমদানি করতে হবে। তবে ঘাটতি পূরণে প্রাধান্য থাকবে গমের, চাল আমদানি হবে কৌশলের। উন্নয়ন সহযোগীরা আফ্রিকার কিছু দেশে ধনী ও সচ্ছলদের পছন্দনীয় শস্যের পরিবর্তে অভাবগ্রস্তদের জোয়ার (Sorghum) সরবরাহের মাধ্যমে বিতরণ ব্যবস্থায় বিরাজমান চুরি কমানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। এখানেও এ জাতীয় পদক্ষেপ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ফলবতী হতে পারে। কিছু চালের আমদানি সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে তার আগে প্রকৃত ঘাটতি ও উৎপাদন সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করতে হবে। দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো, সময়মতো তথ্য পাওয়া-না পাওয়া এবং যে তথ্য পাওয়া যায়, তার বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে না পারা। সরকারি পর্যায়ে যেকোনো পণ্য আমদানির জন্য অন্ততপক্ষে দুমাস সময়ের প্রয়োজন হয়। এটা মাথায় রেখেই সময়মতো আমদানির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরেকটা বিষয় হলো, আমদানির বেলায় উৎসের বহুমুখীকরণ অতীব জরুরি। স্বল্প সময়ের মধ্যে চাল আমদানির জন্য আমরা প্রধানত ভারতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, প্রয়োজনের মুহূর্তে ভারত নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে আদৌ কাজ করে না । মিয়ানমার আমাদের আরেক প্রতিবেশী এবং চাল উৎপাদনে উদ্বৃত্ত একটি দেশ। সম্পর্কের শীতলতা সত্ত্বেও ২০১৭-১৮ সালের খাদ্য সংকটকালে ওই দেশ থেকেই এখানে আমদানির প্রথম চালানটি এসেছিল, ভারত থেকে বা অন্য কোনো দেশ থেকে নয়। কিন্তু পরবর্তীকালে এই সম্পর্কটা আর ধরে রাখা হয়নি। ১৯৬০ সালে বিশ্ব ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত Indus Waters Treaty  অনুযায়ী ১৯৬৫ সালে যুদ্ধের সময়ও উভয় দেশ নিজ নিজ হিস্যা অনুযায়ী পানি ব্যবহার করে আসছিল। অথচ রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে এ দেশের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার অবরুদ্ধ হয়ে আছে। চালের দাম বাড়লে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যাবে, সন্দেহ নেই। তবে সস্তায় চালের বিকল্প পণ্য লভ্য হলে এ অবস্থা কোনো সমস্যা নয়। এতে বরং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়ে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিয়ে আসার পথ প্রশস্ত হবে। তাছাড়া দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারীদের জন্য রাষ্ট্রকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে হবে। তাদের জন্য সরবরাহ করতে হবে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যশস্য ও পণ্য। তবে সেটা এমনভাবে প্রদেয় নয়, যা তাদের কর্মস্পৃহাকে অবদমিত করে, জীবন মূল্যবান পণ্যসামগ্রী ভোগে অভ্যস্ত হয় এবং বিনাশ্রমে উপভোগ্য হয়। অর্থনীতির স্বার্থেই এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, খাদ্য অধিদপ্তর ও কলামিস্ট

rulhanpasha@gmail.com