১৯৪৮ সালে পশ্চিমা নীলনকশায় ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উদ্বাস্তু হয়ে সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই হয় মাহমুদ আব্বাস ওরফে আবু মাজেন নামের এক কিশোরের পরিবারের। ১৯৩৫ সালে ফিলিস্তিনের ‘সাফেদ’ নামের যে অঞ্চলে আব্বাসের জন্ম হয়েছিল, সেটি পরে দখল করে নেয় নব্য দখলদার জায়নবাদী শক্তি। এর ঠিক ৪৫ বছরের মাথায়, আব্বাস যখন পরিপুষ্ট রাজনীতিক, একটি চুক্তি সই করেছিলেন। এখন তিনি ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রেসিডেন্ট। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার (পিএলও) নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন শান্তির পথে ফিরতে সেই চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন। এতে ফাতাহ এবং পিএলও প্রতিনিধি হিসেবে আব্বাসই ‘অসলো চুক্তি’ সই করেছিলেন। ঘটনাচক্রে, এ শতকের গোড়ার দিকে ইয়াসির আরাফাত প্রয়াত হন। এ সময় দেশহারা ফিলিস্তিনিদের মুক্তির কা-ারি হিসেবে আবির্ভূত হন আব্বাস।
অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের শাসনকার্য পরিচালনার আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি পায় ‘প্যালেস্তিনিয়ান অথরিটি’ তথা পিএ। আরাফাতপর্ব পেরিয়ে আব্বাসের শাসনকালে ফিলিস্তিনিরা দুই দশকে কী পেল এ প্রশ্নটি উঠছে দীর্ঘদিন থেকে। বিশেষত, ইসরায়েলি গোলার আঘাতে গাজার অর্ধলক্ষ মানুষের যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর পাশাপাশি হাজার হাজার নারী-শিশুর অসহনীয় যুদ্ধক্লান্ত ছবিগুলোর দিকে তাকালে আব্বাস ও পশ্চিমাপন্থি পিএ’র প্রতি ক্রোধের বিস্ফোরণ হয়। আব্বাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমা মদদপুষ্ট স্বৈরাচার শাসকদের ছায়া পাওয়া যায়। তফাৎটা এই, আব্বাসের গায়ে ধর্মনিরপেক্ষতার আলখাল্লা, আর আরব শেখদের গায়ে ধর্মের। ধর্মনিরপেক্ষ ‘ফাতাহ’ নেতা আব্বাসের বয়স এখন ৮৮ বছর। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও দমে যাচ্ছেন না। ক্ষমতার অলিন্দে তিনি ঝানু খেলোয়াড়। পশ্চিমা শাসকদের সঙ্গে প্রায়শই তার উষ্ণ বৈঠক আর মতবিনিময়ের ছবি দেখা যায়। আরাফাতের মৃত্যুর পর থেকে তিনি ফাতাহ এবং পিএ প্রশাসনের মাথায় বসে রয়েছেন। প্রশাসনে তিনিই শেষ কথা। বস্তুত, গাজার নারকীয় বীভৎস হত্যালীলার পাশে দৃশ্যমান আব্বাসের উদাস, বিহ্বল আর দিশাহীন অভিব্যক্তির অন্তরালে আগ্রাসী ক্ষমতালোভী চেহারাটা নিদারুণভাবে ফুটে ওঠে। গাজা উপত্যকায় তো আব্বাস কর্র্তৃত্ব হারিয়েছেন বেশ আগেই। কিন্তু পশ্চিম তীর, যেখানে তার অথর্ব নেতৃত্বের লেশমাত্র অবশিষ্ট, সেখানে তিনি এবং তার প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। পশ্চিম তীরে শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রতিদিন ইসরায়েলিদের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার প্রশ্নে পিএ প্রশাসন কার্যত অকার্যকর। দখলদার ইহুদিদের বিরুদ্ধে তাদের মুখ খোলার শক্তি নেই। অনেক জায়গায় তাদের কর্র্তৃত্ব খর্ব করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। শরণার্থী শিবিরগুলোতে দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর খবরদারিতে কিছুই বলার থাকে না পিএ প্রশাসনের। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইসরায়েল ও পিএ প্রশাসনের যৌথ নিরাপত্তা কার্যক্রমের বলি হন ফিলিস্তিনিরা। এমন ঘটনাও হয় যে, পিএ বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে ইসরায়েলিদের হাতে তুলে দেয়। ক্ষেত্রবিশেষে, পিএ বা আব্বাসের সমালোচকদের গ্রেপ্তার-নিপীড়নের অভিযোগও পাওয়া যায়। অনেকে কৌতুক করে বলেন, পিএ হলো ইসরায়েলি দখলদারি কার্যক্রমের ঠিকাদার। গাজার নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্যে আব্বাস কোথায়, পিএ প্রশাসনই-বা কোথায়? উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষ তথা পিএ যতটা ক্ষমতা পাওয়া কিংবা চর্চা করার সুযোগ পেয়েছিল, আব্বাস এখন সেটুকু হারিয়েছেন। তার অবস্থা এখন বাংলা প্রবাদের সেই নিধিরাম সর্দারের মতো। যার হাতে এখন ঢাল নেই, তলোয়ারও নেই। ইসরায়েলের বানানো এই সর্দারের কপালে এখন স্বৈরাচারের সিলমোহর পড়েছে। পৃথিবীর তাবড় তাবড় স্বৈরাচারের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার সাধারণ পাঠ যা হয়, আব্বাসেরও ঠিক তাই। ফিলিস্তিনের একটি প্রজন্ম কোনো নির্বাচন দেখেনি। গত দেড়-দুই দশকে বারবার তিনি নির্বাচন ঠেকিয়ে দিয়েছেন। নিজের ইচ্ছামতো ব্যক্তিদের দিয়ে শাসনের ছায়া তৈরি করেছেন। কোটি কোটি অর্থ সহায়তার ওপর ভর করে একটি লুটের চক্রে তিনি বসবাস করেন। তাকে জবাবদিহি করতে হয় না কোথাও। পিএ প্রশাসনে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মতো স্বতন্ত্র তিনটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। চুক্তির আলোকে তিনটি অঙ্গকে বিকশিত হওয়ার পথ তৈরি করে দেওয়ার কথা ছিল। সে সময় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিদ্যমান নিয়মতান্ত্রিক ও সশস্ত্র ধারার নানা সংগঠন পিএলওর ছাতার নিচে সমবেত হয়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এই ভেবে যে, ভবিষ্যতের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এই ধরনের চর্চা বড় এক মাইলফলক। তা ছাড়া ফিলিস্তিনিরা আশাবাদী ছিল, যার কারণ হলো, চুক্তির শর্তে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগের সীমানা ধরেই ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের কথা বলা ছিল। বাস্তবে দেখা গেছে, ১৯৯৩ সালের পর কোনো লক্ষ্য আধাআধিও বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু পিএ প্রশাসন আব্বাসের মতো এক পশ্চিমাপন্থি ক্ষমতাবাজের খপ্পরে পড়েছে। পিএ তো বটেই, ফাতাহর মধ্যেও আব্বাসের বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ হয়নি। সমালোচকরা বলেন, গত দুই দশকে আব্বাস শুধু একটা সাফল্যই প্রচার করেছেন, তার সময়ে ফিলিস্তিন জাতিসংঘের অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা পেয়েছে। উল্টো দিকে এ কথাও শোনা যায়, আব্বাসের শাসনকালে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় মুক্তির প্রশ্নটি যেভাবে ও যতটা আড়াল করা সম্ভব হয়েছে, তা অতীতে কখনো হয়নি। এই শতকে ফিলিস্তিনের মুক্তির প্রশ্নে যেখানে কয়েকশ মাইল এগোনোর কথা ছিল, সেখানে পিএ’র জনপ্রতিনিধিত্বহীন নেতৃত্ব গোটা অগ্রযাত্রাকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে দিয়েছে। আব্বাস পিএ প্রশাসনে এতই ক্ষমতাশালী যে বিচার বিভাগের নিয়োগ থেকে শুরু করে আইনি কাঠামো তৈরি এবং নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রিই যেন একমাত্র আশ্রয়। দুনিয়ার সুসভ্য গণতন্ত্র তো বটেই, খুঁড়িয়ে চলা গণতন্ত্রেও এমন নজির পাওয়া যাবে না। আব্বাসের ডিক্রির এতই ক্ষমতা!
গাজা ও পশ্চিম তীরের মধ্যে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিভাজনের পেরেকটাও তিনিই ঠুকেছেন। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনিরা সর্বশেষ ভোটাধিকার পেয়েছিল। সেবার হামাস জনরায় পেলে ইসমাইল হানিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। পরের বছর এক কলমের খোঁচায় হামাস-ফাতাহর ঐক্য সরকারকে ভ-ুল করে দেন আব্বাস। সবাই অবগত, হামাস নিয়ে পশ্চিমাদের বৈরী মনোভাবের কারণে আব্বাস ওই সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময়ের পর আব্বাস থেকে শুরু করে পিএ বা ফাতাহর কেউ গাজায় ঢুকতে পারেন না। গাজা ও পশ্চিম তীরের ঐক্যবদ্ধ শাসক হিসেবে পিএ স্বীকৃত হলেও, উপত্যকায় আব্বাসের নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস নেই। সে সময় আব্বাস পশ্চিমাদের অবস্থানের ব্যাপারটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে কর্র্তৃত্ব জারি রাখতে এবং অনুসারীদের ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করতে ডিক্রি জারির মাধ্যমে হানিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সেই থেকে পিএ প্রশাসনের আইনসভা অকার্যকর রয়েছে। গাজা যুদ্ধের মধ্যে আব্বাসের অঙ্গুলি হেলনে মোহাম্মদ শাতায়েহকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ মুস্তফাকে নিয়োগ করা হয়েছে। শোনা যায়, এ সিদ্ধান্তও এসেছে ব্রাসেলস-ওয়াশিংটন থেকে। পিএ প্রশাসন ফিলিস্তিনিদের বৈধ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসেবে তারা প্রায় দেড়শ দেশের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। অর্থাৎ একে ঘিরে যে শুধু ফিলিস্তিনিরা স্বপ্ন দেখেছিল, তা নয়। গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষ এই কাঠামোটিকে ইসরায়েলি দখলদারি অবসানের উপায় ভেবেছিল। বাস্তবতা হলো, ইসরায়েলি ডানপন্থি ও মধ্যপন্থি নেতৃত্ব যেমন ক্রমাগত ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আব্বাসের নেতৃত্ব আপসের চূড়ান্ত সীমারেখা দিয়ে হেঁটেছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান হতাশাই ছিল হামাসের ৭ অক্টোবরের প্রাণশক্তি ও জ্বালানি। ইসরায়েলি প্রশাসনের দমননীতির চেয়েও তাদের আপসকামিতা ফিলিস্তিনিদের আশাহীন-দিশাহীন করে তুলেছে। গাজা যুদ্ধের মধ্যে বেশ কয়েকটি জরিপে আবাসের অজনপ্রিয়তার কথা উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, অনেকগুলো জরিপই বলছে, অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বর্তমান পিএ প্রশাসনের অস্তিত্ব দেখতে চান না।
আবু মাজেন দামেস্ক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নপর্ব শেষ করে মস্কোতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পিএলওতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। শরণার্থী জীবনের গ্লানি তার জীবনের জন্য প্রকটতম বাস্তবতা। পিএলওর উত্থান, প্রথম ও দ্বিতীয় ইন্তিফাদা (ফিলিস্তিনিদের জাগরণ), নাকবা (ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বিপর্যয়) এবং পশ্চিম তীরের জীবন-জীবিকা-বসতিহারা মানুষের আর্তনাদ আব্বাসের জীবনের প্রত্যক্ষ ঘটমানতা। তবে আব্বাস পশ্চিমা শাসকদের দিকে তাকিয়ে বারবার এক বিস্মৃত হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন। আব্বাস তবুও নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার পথ ছাড়েননি। পৃথিবীতে সশস্ত্রতার ভাষা যদি কোথাও একমাত্র ন্যায্য হয়, সেই ভূমি হচ্ছে ফিলিস্তিন। পশ্চিম তীরের জেনিন থেকে রামাল্লা কিংবা গাজার সরু সড়ক থেকে জীর্ণ তাঁবুর সর্বত্রই প্রতিদিন পরাধীনতা কাটানোর জন্য হাজার হাজার তরুণ আত্মাহুতির ব্রত নেয়; সেখানে আব্বাসের মতো নেতার জীবনের কোনো পর্বে সেই বিপ্লবী রোমাঞ্চের চিহ্ন নেই। আব্বাস কিছু আর্থিক প্রণোদনাকেই টিকে থাকার রসদ ভেবে আসছেন। শুধু আব্বাস নন, পিএর দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের বেশিরভাগ আব্বাসের পদাঙ্কধারী। এমনকি গাজার জনপদকে মেরে মাটিতে পিষে ফেলার দিনগুলোতেও আবু মাজেন ওয়াশিংটনের ক্ষমতাবৃত্তের নতুন প্রাণপুরুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আব্বাস ফিলিস্তিনের ‘নির্লজ্জ’ রাজনৈতিক ‘এলিট’ শ্রেণির গোষ্ঠীবলয়ের একজন। ইতিহাসে দেখা যায়, সত্তরের দশকে আব্বাসের মতো গুটিকয়েক লোকজন ইসরায়েলিদের সঙ্গে শান্তির দফারফা করতে আলোচনার পথ বেছে নিয়েছিলেন। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আলোচনার টেবিলে টেনে আনার মতো মোড়ল (সোজা বাংলায় ‘মাতব্বর’) ছিলেন এই আব্বাস। এ শতকের শুরুতে দ্বিতীয় ইন্তিফাদাকে ইয়াসির আরাফাত সমর্থন করলেও, আব্বাস গণজাগরণের বিরোধিতায় নামেন। মোদ্দাকথা, আব্বাস আগাগোড়া পিএ ও ফাতাহর আলোচনাপন্থি অংশের বড় মোড়ল। জীবন সায়াহ্নে এসে আব্বাস হয়তো আর বেশিদিন পিএ প্রশাসনে থাকবেন না। তবে তিনি ফিলিস্তিনিদের শাসনকাঠামো আর জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে যে ক্ষতি করেছেন, তা শুধু কলঙ্কিত খলনায়কের পক্ষেই সম্ভব।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
musfikur.muzahid1993@gmail.com