আধিপত্যের অটুট সংস্কৃতি

বাংলাদেশ আরও একটি গণ-অভ্যুত্থান দেখেছে। এক রক্তাক্ত আন্দোলনের ফলে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করা শেখ হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়েছেন। পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের। দীর্ঘ সময় অপ্রতিরোধ্য মনে হলেও, প্রবল শক্তিধর সেই সরকারের পতন ঘটিয়েছে জনতা। দেশ-বিদেশে নানা শক্তির সমর্থনে টিকে থাকা সেই সরকার আর তার ব্যবস্থা ধসে পড়েছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। আর এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। ছাত্রদের সঙ্গে সংগত দিয়ে দেশবাসীও বৈষম্যবিরোধী একটা দেশের স্বপ্ন দেখে। স্বৈরাচারের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হতে চায়। ভেঙে দিতে চায় আধিপত্যের সংস্কৃতি। যে জাতি লাখো শহীদের রক্তে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটা সাম্যের দেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তারা সেই গৌরবজনক ঐতিহ্য বজায় রেখে আরও একবার লড়াই করে।

আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তিন মাসের বেশি পার হয়ে গেলেও আধিপত্যের সংস্কৃতি ভেঙে ফেলা যেন সুদূরপরাহত। এখনো নানা ক্ষেত্রে পুরনো সেই সংস্কৃতিই দৃশ্যমান। সোমবার রাজধানীর ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে এমনই আলাপ উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে। কর্র্তৃত্ববাদী সরকার পতনের ১০০ দিনের পর্যবেক্ষণের এই প্রতিবেদনে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে উঠে এসেছে রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন বন্দোবস্ত, সরকারের পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সমঝোতা, নতুন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ইত্যাদি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, রাষ্ট্র সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত না হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের বহুমাত্রিক ভিত্তির ফলে এই সরকারের অংশীজনরা দেশকে সত্যিকারের রূপান্তরের দিকে নিতে পারে। আরও একটা আন্দোলনে বিজয়ের পর বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কার চায়, যা এই সরকারের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে। এই সরকারের কর্মকা- বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বাস্তবায়নে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় কৌশল ও রোডম্যাপ প্রণয়নের সুযোগ নেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে জনগণকে অন্ধকারে রাখা সরকারের ওপর আস্থা কমিয়ে দেবে। জনগণসহ রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের ব্যাপারে ইতিবাচক বলেই প্রতীয়মান হয় এবং সময় দিতেও কার্পণ্য করবে বলে মনে হয় না। তবে সরকারের দিক থেকে রোডম্যাপ প্রণয়ন আশু জরুরি। বিষয়টি জানা জনগণের অধিকারও।

প্রতিবেদনে সরকার পরিচালনা নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ্যাডহক প্রবণতা, উপদেষ্টা পরিষদ গঠন ও দায়িত্ব বণ্টনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হয়েছে। প্রশাসন পরিচালনায় সরকারের দক্ষতা ও কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দখল ও আধিপত্য বিস্তারের সংস্কৃতি এখনো চলমান, যা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে বেমানান। এত রক্তঝরা আন্দোলন কেবলমাত্র ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এমন একটি রাষ্ট্রের আশায় করা হয়েছে যেখানে ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারেও সমালোচনা করেছে প্রতিবেদনটি। দলগুলো ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের ওপর অযাচিত চাপ প্রয়োগ করছে। এ ছাড়াও গণমাধ্যমের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ, হুমকি-হামলাসহ কোনো কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করার তৎপরতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের কারণে জেন্ডার, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশে একটা বড় পরিবর্তন হয়ে গেছে। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ভারতের সরকার, রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিয়ে অপতথ্য ও অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এসব ঘটনা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার জন্য ক্ষতিকারক। ভারত সরকারকে এই বার্তা দিতে হবে যে, দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জনগণের, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নয়। কেবল রাজনৈতিক এবং সামাজিক নয়, কূটনৈতিক চিন্তা ও দক্ষতাতেও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এইসব পরিবর্তন হতে হবে গণমুখী। জনগণের ত্যাগ-তিতিক্ষায় যে মুক্তির সুবাতাস বইছে তাকে কাজে লাগিয়ে একটি গণমুখী ও জনকল্যাণময় রাষ্ট্র গঠন করতে হবে, যার ভিত্তি হবে বৈষম্যহীনতা। যেখানে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী আধিপত্য দেখাতে পারবে না।