জড়িতরা ঘুরে বেড়াচ্ছে চুপচাপ বসে প্রশাসন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে ভাত খাওয়ানোর পর তোফাজ্জল নামে এক ‘ভারসাম্যহীন’ যুবককে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা মামলার ২ মাস পার হলেও তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ৬ শিক্ষার্থীকে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ। এরপর আরও ১০ শিক্ষার্থীর সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ মিললেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এখনো অন্ধকারেই খাবি খাচ্ছে তদন্ত।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, অভিযুক্ত অনেকেই এখনো ক্যাম্পাসে ঘুরছেন প্রকাশ্যে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ভারসাম্যহীন যুবক বলেই কি তদন্তে গতি নেই? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, যারা শনাক্ত হয়েছে তাদের সব তথ্য বের করতে সময় লেগেছে। তদন্ত শেষ পর্যায়ে তারপর চার্জশিট হয়ে গেলে জবানবন্দি নিয়ে বাকিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ নিয়মিত আমাদের আপডেট দিচ্ছে। তদন্ত যাতে নিখুঁত হয় সে অনুযায়ী কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সব জায়গা থেকে অভিযুক্তদের তথ্য নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে। তারপর দ্রুত চার্জশিট হয়ে গেলে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা যাবে। তবে হলের ভেতর থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা একটু কঠিন। সে কারণেও বেগ পেতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত সিন্ডিকেট না হওয়ায় আরেকটি তদন্ত কমিটি এখনো করা যায়নি।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ফজলুল হক মুসলিম হলের দক্ষিণ ভবনে গেস্ট রুমে ৩২ বছর বয়সী মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেন নির্যাতনের শিকার হন। কয়েকজন শিক্ষার্থী ওই যুবককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরের দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা। মর্গ সূত্রে জানা যায়, তোফাজ্জলের দুই হাত, দুই পায়ে পেটানোর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করার পর ৬ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, যারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠায় আদালত। আর এ ঘটনায় হল প্রশাসনের তদন্ত কমিটিতে ৮ ছাত্রের সংশ্লিষ্টতা পেয়ে সাময়িক বহিষ্কার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের জবানবন্দি এবং পুলিশের তদন্তে আরও ৮ জনের নাম উঠে আসে বলে জানা যায়।

তোফাজ্জল হত্যার ঘটনায় ফজলুল হক মুসলিম হল প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয়জন হলেন পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের জালাল মিয়া, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সুমন মিয়া, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের আল হোসাইন সাজ্জাদ, গণিত বিভাগের আহসান উল্লাহ ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ওয়াজিবুল আলম। এ ছয়জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তোফাজ্জল হত্যায় সম্পৃক্ত বাকি দুজন হলেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ফিরোজ কবির ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আবদুস সামাদ। তারা এখনো পলাতক আছেন।

এদিকে এ ঘটনায় হল প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি উঠে আসার পর হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. শাহ্ মো. মাসুমকে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তার স্থলে অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুনকে হলটির নতুন প্রভোস্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা বলছেন, হল প্রশাসন তৎপর থাকলে এমন একটি ঘটনা ঘটত না। কোনোভাবেই তারা দায় এড়াতে পারে না। হলের তদন্ত কমিটিতে আসা নামের বাইরেও অনেকে জড়িত। তারা এখনো দিব্যি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমরা দ্রুত জড়িতদের বিচার চাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আরও বেশি তৎপর থাকা উচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, তোফাজ্জল হত্যার ঘটনায় মাত্র ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর আর কোনো কিছুই আমরা জানি না। অথচ আরও কয়েকজন সরাসরি জড়িত কিন্তু তারা হলের মধ্যে প্রকাশ্যেই ঘুরছেন। কেন এই তদন্ত কিংবা বিচারের অগ্রগতি নেই আমরা জানি না। ভারসাম্যহীন হোক কিংবা যেই হোক সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে এমন ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে।

এ ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, হল প্রশাসনের তদন্ত কমিটির বাইরেও আমরা কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত চলমান আছে। আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মুনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ঘটনায় চিহ্নিতদের ক্লোজলি মনিটরিংয়ে রাখা হয়েছে। যেহেতু তদন্তাধীন বিষয়, বেশি কথা বলতে চাই না। তাহলে অপরাধীরা টের পেয়ে পালিয়ে যাবে। তদন্ত চলমান আছে।

নিহত তোফাজ্জল পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের তালুকের চরদুয়ানী গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে এবং কাঠালতলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। প্রায় ১০ বছর আগে তোফাজ্জলের বাবা মারা যান। এর দুই বছর পর মা এবং ৭ বছর পর একমাত্র বড় ভাই মারা যান। এর পর থেকেই পরিবার ও অভিভাবকহীন হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন তোফাজ্জল। তোফাজ্জল বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বঙ্গবন্ধু ল’ কলেজে অধ্যয়নরত ছিলেন। এ অবস্থায়ই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

নিহত তোফাজ্জলের চাচাতো ভাই ফারুক মিয়া বলেন, ‘তোফাজ্জল হত্যার মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমরা এমন নির্মম হত্যাকা- আর দেখতে চাই না।’