বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কয়েকটি মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করায় দুর্নীতি দমন কমিশন তলব করে বেবিচকের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে। গত ১৬ অক্টোবর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ওইদিন যাননি দুদকে। এ নিয়ে বেবিচক কার্যালয়ে চলছে আলোচনা। কর্মকর্তারা বলছেন, এর আগেও তাকে দুদকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু নানা অজুহাতে কখনো দুদকের কার্যালয়ে পা দিতে হয়নি তাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দুদক কর্মকর্তারা বলেছেন, তাকে আবারও নোটিস করা হবে। অভিযোগের জবাব তাকে দিতেই হবে। হাবিবুর রহমানের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে দেশ রূপান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দুদক তলব করে।
জানা গেছে, প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিষয়ে দুদকের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি লিখেছে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। চিঠির জবাবে দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন জানান, তার বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। দুদক থেকে পাওয়া হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে জমা হওয়া অভিযোগ মতে, বেবিচকে যতগুলো মেগা প্রকল্প রয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই অর্থবাণিজ্য করেছেন তিনি। অনিয়ম হালাল করতে তিনি রাতারাতি টেন্ডারের নিয়ম পাল্টে ফেলেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়নকাজে পিডি থাকার সময় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। পরে তাকে পিডির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সিভিল সার্কেল-১-এর দায়িত্বে থাকাকালে দুর্নীতি ও খামখেয়ালিপনার প্রমাণ পাওয়ায় হাবিবুর রহমানকে বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে অদৃশ্য কারণে তাকে একের পর এক মেগা প্রকল্পে পিডির দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে খুলনার খানজাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উন্নয়ন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ ও নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, চট্টগ্রামে শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ এবং প্যারালাল ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান টার্মিনাল সম্প্রসারণ-নবরূপায়ণ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও রানওয়ে সম্প্রসারণ কাজ। এসব প্রকল্পের কাজে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘পার্সেন্টেজ’ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বেবিচক সদর দপ্তর ভবন নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা ছিলেন প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। বিভিন্ন কাজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে তিনি অহেতুক বিলম্ব করতেন। ঠিকাদারের সঙ্গে দেনদরবারের মাধ্যমে ‘পার্সেন্টেজ’ আদায় করে তারপর সিদ্ধান্ত দিতেন তিনি। ফলে ২৪ মাস মেয়াদের কাজ শেষ হয়নি ৭২ মাসেও। তার দুর্নীতির কারণে ভবনের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভবনের জন্য ফার্নিচার ক্রয়ের কাজও বিলম্বিত হচ্ছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের উন্নয়নকাজ করার সময় সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অমান্য করেন তিনি। মেনে চলেননি সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের কোনো ধারা। কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়নকাজে করোনার অজুহাত দেখিয়ে দরদাতার দাখিলকৃত দলিলপত্র সঠিক কি না সেটা যাচাই-বাছাই না করেই দরপত্র চূড়ান্ত করেন হাবিবুর রহমান। ঠিকাদারের টার্নওভার-সংক্রান্ত ব্যাংক নথি যাচাই করেননি। টেন্ডার ডকুমেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, অভিজ্ঞতা সনদ, টেন্ডারারস কান্ট্রি অব অরিজিনে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস কর্তৃক ‘অথেনটিকেট’ করে নিয়ে দরপত্র দাখিল করার কথা। কিন্তু ওই ঠিকাদার বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো দলিলপত্র দেননি। সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর প্রকল্প নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।
দুদকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অনেক অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তার বক্তব্য জানতে চেয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছে। তিনি আসেননি। আবারও তাকে নোটিস দেওয়া হবে। তারপরও যদি তিনি না আসেন, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।